জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্যগ্রহন অব্যাহত রয়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ সাক্ষ্য দেন তিনজন সাক্ষী। এ নিয়ে মোট ৩৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। এসব সাক্ষীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পুলিশের এসআই মো. আশরাফুল ইসলাম। গতকাল কাঠগড়ায় দাড়িয়ে তিনি সাক্ষ্য দিয়েছেন গত বছরের ৫ আগস্ট চাঁনখারপুল এলাকায় আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে কিভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তার বর্ণনা। এমনকি গুলি করা থেকে বিরত থাকলে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্বরত এক পুলিশ কর্মকর্তা হুমকি দিয়ে তাদের বলেন, “তোরা সরকারের বেতন রেশন খাস না? গুলি করবি না কেন? তোদের চাকরি খেয়ে নিবো।” বিচারপতি মো. গোলাম মুর্তজা মজুমদারের নের্তৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে অন্য সাক্ষীরা জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যার দায়ে শেখ হাসিনা, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের শাস্তি দাবি করেন। এ সময় ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম, বিএম সুলতান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
জবানবন্দিতে এসআই আশরাফুল বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ৫ আগস্ট ৬০/৬৫ জন পুলিশ এডিসি শাহ আলম মোহাম্মদ আক্তারুল ইসলাম স্যার, এসি ইমরুল স্যার, ইন্সপেক্টর মোঃ আরশাদ হোসেনের নেতৃত্বে ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ডিউটিতে পৌছাই। সেখানে পৌছে এসি ইমরুল স্যারসহ কয়েকজন সহ কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করলে আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কয়েকজন আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করে শাহবাগ থানায় আনা হয়। আক্তারুল স্যারের নির্দেশে এসি ইমরুল স্যার, ইন্সপেক্টর আরশাদ স্যার, আনুমানিক ১৫/২০ জন এপিবিএন সদস্য, ডিএমপির ১০/১৫ জন সদস্যের সাথে আমিসহ আমার সঙ্গে থাকা কনস্টেবল পিয়াস, আসিফ, আকাশ, নাসিরুলসহ পায়ে হেটে সাড়ে ১০ টা থেকে ১১ টার দিকে চানখারপুলে পৌছাই। চানখারপুল সংলগ্ন বংশাল ও চকবাজার এলাকা থেকে আসা ছাত্র-জনতা মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচীতে শাহবাগের দিকে যেতে চাইলে আক্তারুল স্যারের নির্দেশে কোন প্রয়োজন ছাড়া সাউন্ড গ্রেনেড, গ্যাস গান ও শর্টগান দিয়ে ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য করে চানখারপুল মোড়ে গুলি করা হয়। এপিবিএন পুলিশকে দিয়ে শর্টগান ফায়ার করে ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করা হয়। ঐ সময় আক্তারুল স্যার বলেন, “তোমাদের যাদের কাছে পিস্তল ও চায়না রাইফেল আছে তারা আন্দোলনকারীদের প্রতি ফায়ার করে তাদেরকে মেরে ফেলো”।
জবানবন্দিতে আশরাফুল বলেন, তখন আমিসহ আরো কয়েকজন অবৈধ আদেশ পালন না করলে স্যার আমাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করতে থাকে। তিনি আমাদেরকে হুমকি দিয়ে বলেন, “তোরা সরকারের বেতন রেশন খাস না? গুলি করবি না কেন? তোদের চাকরী খেয়ে নিবো”। তথাপিও আমি আমার পিস্তল দিয়ে ফায়ার করা থেকে বিরত থাকি। এরপর কনস্টেবল মো. নাসিরুল ইসলাম আক্তারুল স্যারের সরবরাহ করা অতিরিক্ত গুলি ব্যবহার করে স্যারের নির্দেশে ও দেখানো মতে রাস্তায় বসে চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের টার্গেট করে বার বার ফায়ার করতে থাকে। এ সময় আক্তারুল স্যার এপিবিএন পুলিশের একজন কনস্টেবলের হাত থেকে চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে এপিবিএন পুলিশের কনস্টেবল সুজন হোসেনের হাতে দেয়। কনস্টেবল সুজন চানখারপুল মোড়ে কখনো দাড়িয়ে, কখনো শুয়ে, কখনো হাটু গেড়ে বসে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে চাইনিজ রাইফেল দিয়ে গুলি করতে থাকে। এপিবিএনের কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ইমন তার নামে ইস্যুকৃত চায়না রাইফেল দিয়ে আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি করে। গুলিতে বেশ কয়েকজন আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে অন্য আন্দোলনকারীরা তাদেরকে ধরাধরি করে নিয়ে যাচ্ছে। অতঃপর এসি ইমরুল স্যার, ইন্সপেক্টর আরশাদ স্যার এপিবিএনের ৫/৭ জন সদস্য নিয়ে নাজিমুদ্দিন রোডের বিভিন্ন গলিতে গুলি করতে করতে প্রবেশ করলে আমরা চায়না রাইফেলের গুলির শব্দ শুনতে পাই। এরপর শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছে শুনতে পেয়ে দুপুর আনুমানিক আড়াইটার সময় চানখারপুল এলাকার পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। তখন এডিসি আক্তারুল স্যারের নির্দেশে টিএসটি মোড় হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে শাহবাগ থানার পিছন দিক দিয়ে থানায় প্রবেশ করি। নিজ নিজ নামে ইস্যুকৃত অস্ত্রগুলো শাহবাগ থানার অস্ত্রাগারে জমা দেই। পরে পোশাক পাল্টে সিভিল ড্রেস পরে এশার নামাজের পরে শাহবাগ থানার পিছন দিয়ে বের হয়ে পায়ে হেটে ছাত্র-জনতার সাথে মিশে মিরপুর পুলিশ লাইনে রাত আনুমানিক ১১ টায় পৌছাই।
এছাড়া ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ হাসান ও চাঁনখারপুল এলাকার অধিবাসী সোহেল মাহমুদ। তারা তাদের সাক্ষ্যে ছাত্র-জনতাকে হত্যার জন্য শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল, অন্যান্য মন্ত্রীগণ এবং স্থানীয় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা দায়ী। তাদের কঠোর বিচার চাই। সাক্ষ্য শেষে তাদেরকে জেরা করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত কৌসুলি মো. আমির হোসেন।



