ডাকসুতে স্বতঃস্ফূর্ত ভোট, প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

উৎসবের আমেজে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। এ নিয়ে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছিল এক উৎসবমুখর মেলায়। বহু প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচনে গতকাল সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের পদচারণায় সরগরম ছিল পুরো ক্যাম্পাস। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা লাইন ধরে ভোট দেন আনন্দ-উচ্ছ্বাসে, যেন গণতান্ত্রিক চর্চার এক নতুন ভোরের সূচনা হলো দেশের বুকে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি ছিলো ডাকসু নির্বাচন। দীর্ঘ এক বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মিছিল-মিটিং আর প্রত্যাশার পর অবশেষে অনুষ্ঠিত হলো সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন।এই নির্বাচন শুধু ভোট নয়, বরং তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নের এক মহাযাত্রা। দেশজুড়ে আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এ নির্বাচন। দিনব্যপী ভোটগ্রহণের সময় প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও কোনো বড় অনিয়ম ছাড়াই উৎসবমূখর পরিবেশে শিক্ষার্থীরা ভোট দিতে পেরেছেন। ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের দেওয়া প্যানেলগুলো নানান অভিযোগে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিলেও কোথাও কোনো অপ্রীািতকর ঘটনা ঘটেনি। এসময় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ছাত্রশিবিরের প্রার্থীরা ভোট কারচুপি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে একপাক্ষিক আচরনের অভিযোগ তোলেন। এছাড়া অন্যান্য ছাত্রসংগঠনগুলোও ভোটগ্রহণ এবং পোলিং অফিসার নিয়োগে প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন।
পূর্ব ঘোষিত তফশিল অনুসারে গতকাল সকাল ৮ টা থেকেই শুরু হয় ভোটগ্রহণ। এদিন সকাল সাতটার পর থেকেই ভেটাররা ভোটকেন্দ্রে ভীড় জমাতে থাকে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে এটি পরিণত হয় দীর্ঘ লাইনে। ভোট গ্রহণ চলে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ৪টার মধ্যে পর্যন্ত যারাই সিরিয়ালে ভোট দেওয়ার অপেক্ষায় ছিলো, সবার ভোটই নেওয়া হয়েছে। এবার ডাকসু নির্বাচনে ২৮টি পদের বিপরীতে মোট ৪৭১ জন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছে এবং ১৮টি হল সংসদ নির্বাচনে ২৩৪টি পদে ১ হাজার ৩৫জন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছে। চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার সংখ্যা ৩৯ হাজার ৭৭৫ জন। সবমিলিয়ে প্রায় ৯টি প্যানেল অবতীর্ণ হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে অনেক স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বী।
মোট ৮টি পৃথক ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে মোট ৮১০টি ভোট দেওয়ার বুথ দেওয়া হয়েছে।
ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার এক ঘন্টা আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়াজ আহমেদ খান জানান, ডাকসু নির্বাচনে আনুমানিক ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছেন। তবে নির্বাচন কমিশনের একাধিক সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, শেষ পর্যন্ত ৮০ শতাংশের কাছাকাছি ভোটগ্রহণ হয়েছে।
এবছর ডাকসু নির্বাচন মোট ৮টি ভোটকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হয়। কার্জন হলে ভোট দেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, অমর একুশে হল ও ফজলুল হক মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ হাজার ৭৭ জন। কার্জন হল কেন্দ্রের রিটার্নিং অফিসার এম এম মহিউদ্দীন বলেছেন, ফজলুল হক মুসলিম হলে ১৪৪৩ জন, শহীদুল্লাহ হলে ১৯০৯, অমর একুশে হলে ১ হাজার ৮৩ জন ভোট দিয়েছেন। অর্থাৎ কেন্দ্রটিতে মোট ভোটের হার ৮৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন রোকেয়া হলের শিক্ষার্থীরা। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ হাজার ৬৬৫ জন। কেন্দ্র-প্রধান শামসুন নাহার হলের প্রভোস্ট নাসরীন সুলতানা বলেছেন, এখানে ভোট দিয়েছেন ৩ হাজার ৯০৭ জন, যা প্রায় ৬৯ শতাংশ। নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ভোট দেন বিজয় একাত্তর হল, স্যার এ এফ রহমান হল, হাজী মুহম্মদ মুহসীন হল ও বিজয় একাত্তর হলের শিক্ষার্থীরা। এখানে মোট ভোটার ৪ হাজার ৮৩০ জন। কেন্দ্রের পোলিং অফিসার অধ্যাপক আইনুল ইসলাম বলেন, বিজয় একাত্তর হলে ৮৫ শতাংশ, এ এফ রহমান হলে ৮৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং মুহসীন হলে ৮৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ কাস্ট হয়েছে। সব হল মিলিয়ে ৮৪ শতাংশ কাস্ট হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থীরা। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ হাজার ৭৫৫। কেন্দ্র প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক শারমীন কবীর বলেন, তার কেন্দ্রে ৭০ শতাংশের কাছাকাছি ভোট কাস্ট হয়েছে।
ইউল্যাব স্কুল কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন শামসুন নাহার হলের শিক্ষার্থীরা। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৪ হাজার ৯৬ জন। কেন্দ্র প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা শহিদুল জাহিদবলেন, কেন্দ্রটিতে ৬৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। উদয়ন স্কুল কেন্দ্রে সূর্যসেন হল, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল ও কবি জসীমউদ্দীন হলের শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়েছেন। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ৬ হাজার ১৫৫ জন। কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক শামীম রেজা বলেন, চারটি হলে মোট ভোটার ছিলেন ৬ হাজার ১৬৩ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪১ জন ভোট দিয়েছেন, যা প্রায় ৮৩ শতাংশ। তিনি বলেন, সূর্যসেন হলে মোট ভোটার ছিলেন ১ হাজার ৪৯৮ জন। এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৩১৬ জন, যা প্রায় ৮৮ শতাংশ। জসীম উদ্দিন হলে মোট ভোটার ১ হাজার ৩০৩ জনের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ১১৭ জন, যা ৮৬ শতাংশ। জিয়া হলে মোট ভোটার ছিলেন ১ হাজার ৭৫৩ জন, এর মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৩১৫ জন, যা প্রায় ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে মুজিব হলে মোট ভোটার ছিলেন ১ হাজার ৬০৯ জন। এর মধ্যে ভোট কাস্ট হয়েছে ১ হাজার ৩৯৩টি, যা ৮৭ শতাংশ।
ভূতত্ত্ব বিভাগ কেন্দ্রে সুফিয়া কামাল হলের ৪ হাজার ৪৪৩ শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্র-প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মারুফুল ইসলাম বলেছেন, কেন্দ্রটিতে ২৯৪৭ জন ভোট দিয়েছেন। মোট ৬৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ কাস্ট হয়েছে।
শারীরিক শিক্ষা কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন জগন্নাথ হল, শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের শিক্ষার্থীরা। কেন্দ্রটিতে মোট ভোটার ৪ হাজার ৮৫৩ জন। কেন্দ্রের প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তা কাজী মোস্তাক গাউসুল হক বলেন, এ কেন্দ্রে তিনটি বুথে মোট ৪ হাজার ৮৬১ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ৪ হাজার ৪৪ জন, যা প্রায় ৮৩ শতাংশ। তিনি আরও বলেন, এর মধ্যে জগন্নাথ হলে মোট ২ হাজার ২২২ জন ভোটারের মধ্যে ভোট কাস্ট হয়েছে ১ হাজার ৮৩১টি এবং অনুপস্থিত ছিলেন ৩৯১ জন। শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ১ হাজার ৯৬৩ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন ১ হাজার ৬৬০ জন, অনুপস্থিত ছিলেন ৩০৩ জন। স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ৬৬৯ জন ভোটারের মধ্যে ভোট কাস্ট হয়েছে ৫৫৩টি এবং অনুপস্থিত ছিলেন ১১৬ জন।
মোট প্যানেল নয়টি:
এবারের ডাকসু নির্বাচনে এখন পর্যন্ত নয়টি প্যানেল ভোটয়ুদ্ধে অবতীরর্ণ হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ প্যানেল, ছাত্রশিবিরের ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’, উমামা ফাতেমার নেতৃত্বে ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’, বামপন্থি শিক্ষার্থীদের ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’, ইসালামী ছাত্র আন্দোলেনের সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’, স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংসদের আহ্বায়ক জামালুদ্দিন মুহাম্মাদ খালেদের ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ’ এবং তিনটি বামপন্থী সংগঠনের ‘অপরাজেয় ৭১ অদম্য ২৪’ এছাড়াও কয়েকটি প্যানেল আংশিক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments