সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বাংলাদেশকে অংশগ্রহণকারী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে অন্তবর্তী সরকার।
গতকাল সোমবার বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) চতুর্থ গভর্নিং বোর্ড সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও গভর্নিং বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সভাপতিত্ব করেন। পরে বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় জানানো হয়, মিরসরাইয়ে প্রায় ৮৫০ একর জমি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে মাস্টার প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আগে এই জমি ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত থাকলেও প্রকল্প বাতিল হওয়ায় তা নতুনভাবে পুনঃব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে আশিক চৌধুরী বলেন, ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে জিটুজি কাঠামো থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। সেই জায়গা খালি আছে। সেখানের প্রায় ৮৫০ একর জমিতে হবে এ জোন।
সামরিক অস্ত্র উৎপাদনে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, সেটি নিয়ে তারা অনেকদিন ধরে আলাপ-আলোচনা করছেন। এর এই মুহূর্তে আসলে বৈশ্বিক চাহিদা আছে। একদম খাঁটি অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে চিন্তা করলেও ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশ অংশগ্রহণকারী হিসেবে কাজ শুরু করতেই পারে।
আশিক চৌধুরী জানান, বৈশ্বিক যে অবস্থা সেখানে আসলে সমরাস্ত্র তৈরি বা তা করতে পারার সক্ষমতা আসলে খুব জরুরি। কারণ যখন সরবরাহে ঘাটতি হয়, যুদ্ধক্ষেত্রে যখন আপনার কাছে বন্দুকের গুলি না থাকে, সেক্ষেত্রে আর যুদ্ধে গিয়ে যুদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। অনেকগুলো সাম্প্রতিক যুদ্ধে দেখা গেছে যে সরবরাহের ঘাটতিগুলো আসলে উচ্চ প্রযুক্তির জিনিসের না, ঘাটতি হচ্ছে গুলির। ঘাটতি হচ্ছে ট্যাংকের এক্সেলে। ওই জায়গাগুলোতে বাংলাদেশ আসলে কোনো ভূমিকা পালন করতে পারে কি না তা নিয়ে অনেকদিন ধরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বেজা, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়- সবাই মিলে কাজ করছে।
এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব বেজার গভর্নিং বোর্ড সভায় নিয়ে জানানো হয় যে মিরসরাইতে প্রায় ৮৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে মাস্টার প্ল্যানে এটি যুক্ত হবে। ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন হিসেবে এখন থেকে যাত্রা শুরু হবে। এই ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে প্রাথমিকভাবে গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সামরিক উপকরণ উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে বলে জানান তিনি।
বিডা-বেজা-বেপজাসহ ৬ প্রতিষ্ঠান একীভূতকরণ হচ্ছে:
ব্যবসা ও বিনিয়োগের সঙ্গে জড়িত দেশের ছয় প্রতিষ্ঠানকে একীভূতকরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে গভর্নিং বোর্ড সভায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো- বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক)।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের অনেকগুলো ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি আছে। এগুলো একীভূতকরণের একটা প্রপোজাল আগের গভর্নিং বোর্ডে গিয়েছিল। তারপর একটা উপদেষ্টা কমিটি করে দেওয়া হয়েছিল, যেখানে বেশ কজন উপদেষ্টা, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অ্যাটর্নি জেনারেল অনেকেই ছিলেন। উনারা সবাই মিলে একটা সুপারিশ করেছেন।
এজন্য নীতিগতভাবে আমরা একীভূতকরণকে অনুমোদন করেছি। একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থার্ড পার্টি কনসালট্যান্টকে দিয়ে আমরা নতুন অর্গানাইজেশনের ডিজাইনটা করবো ।
ফ্রি ট্রেড জোন গঠনের অনুমোদন:
সভায় প্রথমবারের মতো ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) গঠনের নীতিগত অনুমোদন হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, ফ্রি ট্রেড জোন হিসেবে প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রায় ৬০০ থেকে ৬৫০ একর জমিতে এ জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্রি ট্রেড জোনকে কার্যত ‘ওভারসিজ টেরিটরি’ হিসেবে পরিচালনা করা হবে, যেখানে কাস্টমস বাধ্যবাধকতা ছাড়াই পণ্য সংরক্ষণ, উৎপাদন ও পুনঃরপ্তানি করা যাবে। এ উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের টাইম টু মার্কেট সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল এনে দ্রুত উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। উদাহরণ হিসেবে আমেরিকান কটনের ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়।
এই গুরুত্বপূর্ণ জোন করার জন্য কেন আনোয়ারাকে বাছাই করা হলো- এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ভৌগোলিক দিক বিবেচনায় নিয়েই চট্টগ্রামের আনোয়ারাতে এই জোনটি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, দুবাইয়ের জেবেল আলি ফ্রি জোনের মতো মডেল অনুসরণ করে এ ফ্রি ট্রেড জোন গড়ে তোলা হলে এটি বাংলাদেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে পারে। এ সিদ্ধান্ত কার্যকরে ৮টি আইন ও বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজন হবে। বিষয়টি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য শিগগির মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে।


