ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদী হত্যার সুষ্ঠু বিচার দাবিতে আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। মিছিলে পুলিশি বাধা, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে পুলিশ সংঘর্ষের সময় গুলি করেছে।
এতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও ইনকিলাব মঞ্চের ফাতেমা তাসনিম জুমা (মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক, ডাকসু), শান্তা আক্তার (সদস্য, জকসু), সালাউদ্দীন আম্মার (জিএস, রাকসু) সহ ৫০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বিকাল সাড়ে চারটার দিকে রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে জাতিসংঘের অধীনে নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে ইনকিলাব মঞ্চের নেতা–কর্মীরা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন।
কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড স্থাপন করে।
গতকাল যমুনার সামনে অবস্থান করেন নিহত ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পাসহ কয়েকজন। অপরদিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থান নেন ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) জিএস সালাউদ্দিন আম্মারসহ কয়েক শ বিক্ষোভকারী।
বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ কয়েকজন যমুনার দিকে অগ্রসর হতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। পরে ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত ইনকিলাব মঞ্চের নেতা–কর্মীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ শুরু করলে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এলাকাটি। আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও মারধরের শিকার হয়েছে। বাস ও মোটরসাইকেল থেকে যাত্রী নামিয়ে পেটাতে দেখা গেছে পুলিশকে।
এদিকে, ঘটনার পর বিকেল ৪টা ১২ মিনিটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জুলাই রেভুলেশনারি এলায়েন্স দাবি করে, ‘ইনকিলাব মঞ্চের আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ। জুমা শান্তাকে বুট দিয়ে পাড়ানো হয়েছে।’ পোস্টে সংগঠনটি ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জানায়, তারা ইনকিলাব মঞ্চের পাশে রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।
সংঘর্ষের পর বিকেল সাড়ে চারটার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে আসেন ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচন ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। পরে তার নেতৃত্বে উপস্থিত নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ মিছিল বের করলে তা শাহবাগ মোড়ের দিকে অগ্রসর হয়।
বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। এতে শাহবাগ এলাকায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় তারা ‘হাদি তোমায় দেখা যায়, ইনকিলাবের পতাকায়’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে’, ‘ব্লকেড ব্লকেড, শাহবাগ ব্লকেড’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শাহবাগে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যান তারা।
ঢামেকে চিকিৎসা নিলেন ৫০ জন ঃ
আন্দোলনকারীরা বলছেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারে সরকার ব্যর্থই কেবল হয়নি, উপরন্তু বিচারের দাবিতে আন্দোলনরতদের উপর গুলিবর্ষণ ও হামলা করা হয়েছে। ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, আমাদের এখানে অর্ধশতাধিক রোগী এসেছে। তবে মধ্যে কোন গুলির রোগী পাওয়া যায়নি। যারা আহত হয়ে এসেছেন, তাদের জরুরী বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতে জখম রয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীর জখম ফেটে যাওয়া, থেতলে যাওয়া। এখন পর্যন্ত ভর্তি দেয়ায় মতো রোগী পাইনি।
আহতদের মধ্যে রয়েছেন সালাউদ্দিন আম্মার (২৪), আবদুল্লাহ আল জাবের (২৪), ঝুমা (২৪), মনির (২৪), ফয়সাল (২৪), জয় (২৪), জুলকার (২৩), মোশাররফ (২৪), নিলয় (২৩), অনিক (২৪), উমর (২৪), রাহাত (২৩), রাসেল (২৪), আহাদ (২৩), মাহিন (২৪), আজাদ (২৪), শামিম (২৩), সোহেল (২২), শাওন (৩২), জাবেদ (৩০), ঝুমা (৩০), আম্মাদ (৩০), শামিম (২৮), আঞ্জুমান (৩৫), সাব্বির (২৪), জিসান (২১), মুজিদ (২৩), ইউসুফ (৩৫), রিফাত (২১), ইউসুফ ও লিয়ন (১৯)। আহতদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনারের ভিডিও সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল ঃ
এদিকে, সংঘর্ষ চলাকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোবাইল ফোনে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সাথে কথা বলেন। ডিএমপি কমিশনারের মোবাইল ফোনে কথোকথন সোস্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে ইনকিলাব মঞ্চের আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলীকে বলতে শোনা যাচ্ছে, পেটাও পেটাও, মারো মারো বলে পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছেন। এছাড়া মোবাইল ফোনে ডিএমপি কমিশনারকে বলতে শোনা গেছে, মোটামুটি একটা সাইজে আইনা ফেলছি।
যমুনা থেকে বের করে শেরাটনে কোনটাসা করে রাখছি। গ্যাস-ট্যাস মারছি, ওরাও মারমুখী, খুবই খারাপ। রাত্রে কিছু নেতাকে অ্যারেস্ট করতে হবে। ওই যে আগে অ্যারেস্ট করছিলাম, ওই রকম। আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে করে পুলিশ সদস্যদের বলতে শোনা যাচ্ছে, এই আ্য় আয়, হাদির লাশ নিয়ে যা বলে উপহাস করছে। সাংবাদিকদের কেন হামলা করা হয়েছে এ বিষয়ে পুলিশকে উদ্দেশ্যে করে সাংবাদিকদের বলতে শোনা যাচ্ছে, আমাদের কেন পিটাইলেন, জবাব দেন।
আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশঃ
ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, যমুনা ও আশপাশের এলাকায় বেআইনী সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে কোন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশ। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় যেকোন প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকা সত্বেও শুক্রবার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে একাধিক গোষ্ঠী পুলিশের বাধা অতিক্রম করে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে।
এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এই ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য কতিপয় ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন বলে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং এতে কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করা হয়নি। ওই ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন বিক্ষোভকারীও আহত হয়। এ নিয়ে কোন প্রকার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে সর্বসাধারণকে বিনীত অনুরোধ করা হলো।
নিহতের খবরে সত্যতা নেইঃ
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ’ একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, পুলিশের গুলিতে যমুনার সামনে আন্দোলনরত তিন জন নিহত হয়েছেন। কমপক্ষে আরও ১০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে প্রেস উইং ফ্যাক্ট যাচাইয়ে এমন দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। গতকাল প্রেস উইং ফ্যাক্টস এ তথ্য জানায়। প্রেস উইং ফ্যাক্টসের পক্ষ থেকে বলা হয়, কী-ওয়ার্ড সার্চে একাধিক গণমাধ্যমে যমুনার সামনে লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের খবর পাওয়া গেলেও কোথাও নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া অন্য কোনও নির্ভরযোগ্য সূত্রেও পাঁচজন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।


