প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) সদস্যদের শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহŸান জানিয়ে বলেছেন,আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনাদের নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং গভীর দেশপ্রেমের মাধ্যমে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ভবিষ্যতে প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক সামাজিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
যে কোনো দেশেই যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ ও ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা অনিবার্য ও অবশ্য পালনীয় নীতি। এই দুইটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা থাকলে কোনো বাহিনী প্রকৃত অর্থে সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। আপনাদের এ বিষয়টি গভীরভাবে মনে রাখতে হবে। কোনো বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিলে সেই বাহিনী সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়।

গতকাল বুধবার সকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুরে আনসার ভিডিপি একাডেমিতে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশে একথা বলেন তারেক রহমান। সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
এর আগে সফিপুরে আনসার ভিডিপি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী ও বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষে একাডেমিতে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর সদস্যদের তাঁত ও বুনন শিল্প, মৃৎ শিল্প, গবাদি পশু খামার, জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। সদস্যরা কিভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে তিনি অবহিত হন।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও স¤প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, রেল প্রতি মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এটিএম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানসহ সংসদ সদস্য ও সরকারি ঊধর্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন,আনসার এবং ভিডিপি বাহিনীর কাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে ‘আনসার ব্যাটালিয়ন বিধিমালা, ২০২৬. ‘ভিডিপি প্রবিধানমালা, ২০২৬, অঙ্গীভ‚ত আনসার বিধিমালা, ২০২৬ এবং আনসার ব্যাটালিয়ন সদস্য নিয়োগ ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া প্রণয়নের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
একইসঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে এই বাহিনীর কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে ‘উপজেলা আনসার প্রবিধানমালা ২০২৬’ প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আরো জোরদার করার লক্ষে বাহিনীর সদর দপ্তরে বায়োমেট্রিক উপস্থিতি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে যা আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত।তিনি বলেন,শৃঙ্খলার সামান্য ঘাটতিও জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পেশাদারিত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে আনসার ও ভিডিপি একটি বহুমাত্রিক ও জনমুখী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাহিনীর ভ‚মিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ওই সময় আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভ‚মিকা রেখেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি বাহিনীটি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং

প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করছে।তিনি বলেন, ‘ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভ‚ত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি,এই প্রতিটি শক্তি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রেখে চলছে। আমি মনে করি, এই কাঠামোই বাহিনীটিকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প কলকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিরাপত্তা প্রদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদক বিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক কর্মকাÐে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও স¤প্রীতি জোরদারে আনসার ভিডিপির সক্রিয় ভ‚মিকা রাখার বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাহিনী কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তিনি বলেন, ‘আনসার-ভিডিপি মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সিক্স জি ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। আমি মনে করি, এ ধরণের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা দেশে বিদেশে আনসার ও ভিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও জোরদার করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফাস্ট রেসপোন্ডার’ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। বন্যা, অগ্নিকাÐসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই বাহিনীর সাহসিকতা, দ্রæততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা দৃষ্টান্তমূলক। একই সঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আনসার-ভিডিপির সাফল্যও প্রশংসনীয়। ৫ম, ৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করে।
আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন সুষ্ঠু ও নির্বিঘœভাবে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩৭৯ জন অঙ্গীভ‚ত আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
ক্রীড়াকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান সরকার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব খেলোয়াড় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন, একটি বেতন কাঠামোর আওতায় এনে বর্তমান সরকার তাদেরকে স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে। আপনারা নিঃসন্দেহে জেনেছেন, আনসার ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকেও বর্তমান সরকার স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে।
মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীর অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪০ হাজার আনসার সদস্য রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং ৬৭০ জন সদস্য শহীদ হন। তাদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং আল্লাহর দরবারে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।



