চার বছর আগে কাতারের মরুভূমিতে ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় বিশ্বকাপ ফাইনাল জিতে বিশ্বসেরার মুকুট মাথায় তুলেছিল লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। দীর্ঘ ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তৃতীয় বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দে ভেসেছিল দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। এবার সেই মুকুট ধরে রাখার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে মিশন শুরুর অপেক্ষায় আলবিসেলেস্তেরা।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোয় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। ৪৮ দলের এই টুর্নামেন্টে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে শিরোপা ধরে রাখার কঠিনতাও। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, শক্তিশালী স্কোয়াড এবং জয়ের মানসিকতা আর্জেন্টিনাকে আবারও অন্যতম শিরোপাপ্রত্যাশী দলে পরিণত করেছে। অবশ্য বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, শিরোপা জেতার চেয়েও কঠিন কাজ হলো সেই মুকুট ধরে রাখা। তাই এবারের ২৩তম বিশ্বকাপে দিয়াগো ম্যারাডোনার দেশ আর্জেন্টিনার সামনে অপেক্ষা করছে অগ্নিপরীক্ষা।
আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের দলগত ঐক্য ও আত্মবিশ্বাস। কাতার বিশ্বকাপে দলটি প্রমাণ করেছিল, শুধু তারকানির্ভর ফুটবল নয়, বরং সমন্বিত পরিকল্পনা ও অসাধারণ দলীয় মানসিকতাও বিশ্বকাপ জয়ের মূল চাবিকাঠি হতে পারে। কোচ লিওনেল স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক সাফল্য পেয়েছে। কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা এবং বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে দলটি নিজেদের একটি শক্তিশালী ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এবারের বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার স্কোয়াডেও রয়েছে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের চমৎকার মিশেল। গোলপোস্টে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ এখনো দলের অন্যতম ভরসার নাম। রক্ষণভাগে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার এবং আক্রমণভাগে হুলিয়ান আলভারেজদের মতো ফুটবলাররা এখন নিজেদের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে রয়েছেন। ফলে দলের ভারসাম্য আগের চেয়ে আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্নের নাম একটাই-লিওনেল মেসি। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা এবার তার ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে মাঠে নামছেন। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করেছেন তিনি। ফলে এবার তার ওপর আগের মতো মানসিক চাপ থাকবে না। বরং মুক্ত মনে খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে বয়স একটি বড় বাস্তবতা। ২০২৬ বিশ্বকাপের সময় মেসির বয়স হবে ৩৯ বছর। স্বাভাবিকভাবেই আগের মতো পুরো ম্যাচ জুড়ে দৌড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষকে বারবার কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা কিছুটা কমে যেতে পারে। কিন্তু মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি কখনোই শুধু গতি ছিল না; ছিল খেলা পড়ার অসাধারণ ক্ষমতা, নিখুঁত পাস, সৃজনশীলতা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার দক্ষতা। তাই বয়স বাড়লেও তিনি এখনো দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আস্থার প্রতীক। সবচেয়ে বড় কথা, একজন মেসি মাঠে থাকা মানে দলের বাকি সবাই মানসিকভাবে চাঙ্গা ও উজ্জ্বীবিত থাকবে। এটিই এখনো আর্জেন্টিনার দলের বড় শক্তি।
বিশ্বকাপের মঞ্চে অভিজ্ঞতার মূল্যও কম নয়। মেসি ইতোমধ্যে পাঁচটি বিশ্বকাপ খেলেছেন এবং বিশ্বকাপের প্রায় সব ধরনের চাপ ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তরুণ ফুটবলারদের জন্য তার উপস্থিতি অনুপ্রেরণার উৎস হবে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, মেসি হয়তো আগের মতো পুরো দলের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে খেলবেন না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ম্যাচ নির্ধারণী ভূমিকা রাখার সামর্থ্য এখনো তার রয়েছে। অবশ্য আর্জেন্টিনার পথ মোটেও সহজ হবে না। ইউরোপের শক্তিধর দলগুলোর মধ্যে ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড, পর্তুগাল শিরোপার দৌড়ে আছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল এবারও হেক্সা জয়ের মিশনে নামছে। ৪৮ দলের বিশাল এই বিশ্বকাপে ম্যাচের সংখ্যা বেশি হওয়ায় শারীরিক সক্ষমতা ও স্কোয়াডের গভীরতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।



