মাজারের দানবাক্স–ডেগ বিতর্ক, সিলেটের ডিসি প্রত্যাহার

হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়, দানবাক্স ও ঐতিহ্যবাহী ‘ডেগ’ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানা বিতর্কের মধ্যেই সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করেছে সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে তাকে সিলেটের ডিসির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তবে ওই প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সরকারি ব্যাখ্যা না মিললেও, শাহজালাল মাজারের দান-ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসনের সাম্প্রতিক হস্তক্ষেপই তার প্রত্যাহারের মূল কারণ কি না—তা নিয়ে সিলেটজুড়ে আলোচনা তুঙ্গে উঠেছে।

প্রশাসনিক ও স্থানীয় একাধিক সূত্র বলছে, গত ১২ জুন শাহজালাল ও শাহপরান মাজার পরিদর্শনে গিয়ে ডিসি সারওয়ার আলম দুই মাজারের আয়-ব্যয়ে ‘স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি’ নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন। তিনি তখন জানান, মাজারের দান ও অনুদানের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ, নিয়মিত নিরীক্ষা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে জেলা প্রশাসন কাজ করবে। এই ঘোষণার পরই মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়।

এর ধারাবাহিকতায় ১৮ জুন শাহজালাল (রহ.) মাজারে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নতুন দানবাক্স বসানো হয়। একই সঙ্গে বহু বছরের প্রচলিত তিনটি ঐতিহ্যবাহী ডেগ সিলগালা করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পরীক্ষামূলকভাবে এক মাস নতুন দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থের হিসাব সংরক্ষণ করা হবে। দানবাক্সের নিরাপত্তায় আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপের পরপরই মাজারকেন্দ্রিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

মাজারসংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, শতাব্দীপ্রাচীন রেওয়াজ ভেঙে প্রশাসন একতরফাভাবে মাজারের দান-ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছে। তাদের দাবি, আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা আনার কথা বলা হলেও বাস্তবে এটি মাজারের ঐতিহ্যগত ব্যবস্থাপনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ। খাদেম ও ভক্তদের একাংশের ভাষ্য, মাজারের ডেগ ও দানবাক্স কেবল অর্থ সংগ্রহের মাধ্যম নয়; এগুলো বহু পুরোনো ধর্মীয় ও সামাজিক রীতির অংশ। সে কারণে প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে তারা ‘অপ্রত্যাশিত’ ও ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে দেখছেন।

অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের অবস্থান ছিল ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শাহজালাল ও শাহপরান মাজারে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ, পশু, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য দান আসে। কিন্তু এই অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব, ব্যয়ের খাত এবং তদারকির কোনো সুসংহতওইণ  ব্যবস্থা ছিল না। এ কারণে জনস্বার্থে আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসনের দাবি, মাজারের প্রচলিত ধর্মীয় রীতি বা ঐতিহ্যে আঘাত নয়; বরং অর্থ ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।

বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয় যখন শাহজালাল মাজারের পর শাহপরান (রহ.) মাজারেও একই ধরনের আর্থিক শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক তদারকি আনার কথা প্রকাশ্যে আসে। এতে স্থানীয়ভাবে ধারণা জোরালো হয় যে, সিলেটের দুই প্রধান মাজারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে আনতে চাইছিল জেলা প্রশাসন। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় রাজনীতি এবং ধর্মীয় অঙ্গনে বিস্তর আলোচনা শুরু হয়। কেউ এটিকে স্বচ্ছতার উদ্যোগ হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ বলেছেন—এটি মাজারের ঐতিহ্য ও স্বায়ত্তশাসনে অযাচিত হস্তক্ষেপ।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ২১ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, জনস্বার্থে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে সেখানে প্রত্যাহারের কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল নিয়মিত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, নাকি মাজার-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক বিতর্কের জের?

ঘটনাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১২ জুন মাজার পরিদর্শন ও আর্থিক স্বচ্ছতার ঘোষণা, ১৮ জুন দানবাক্স বসানো ও ডেগ সিলগালা, আর তার তিন দিনের মাথায় ২১ জুন ডিসি প্রত্যাহার—এই সময়রেখাই বিতর্ককে নতুন মাত্রা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, মাজারকেন্দ্রিক উত্তেজনা, ক্ষোভ এবং চাপ সামাল দিতেই শেষ পর্যন্ত সরকার ডিসিকে সরিয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

সিলেটে যোগদানের পর সারওয়ার আলমের কিছু পদক্ষেপ প্রশংসিত হলেও, শাহজালাল ও শাহপরান মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তার সক্রিয় ভূমিকা শেষ পর্যন্ত বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। এখন দেখার বিষয়, জেলা প্রশাসনের শুরু করা স্বচ্ছতা-উদ্যোগ এখানেই থেমে যায়, নাকি নতুন প্রশাসন ভিন্ন কৌশলে তা এগিয়ে নেয়।

একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়ে গেছে—মাজারের আয়-ব্যয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা না গেলেও, সেই প্রক্রিয়ায় ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে। সিলেটের আলোচিত এই ঘটনা আপাতত সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments