কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) ছাত্রী সুমাইয়া আফরিন ওরফে রিনথি (২৩) ও তার মা তাহমিনা বেগম ওরফে ফাতেমাকে (৫২) হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। ছাত্রী রিনথির দেহ থেকে জিন তাড়ানোর জন্য বাসায় ডেকে আনা কথিত ঝাড়ফুঁক কবিরাজ মোবারক হোসেনের হাতেই তারা খুন হয়েছেন। এদের মধ্যে ঐ ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা দেখে ফেলায় তার মা ফাতেমাকে বালিশ চাপা দিয়ে এবং পরে ছাত্রী রিনথিকে গলাটিপে শ^াসরুদ্ধ করে হত্যা করে মোবারক হোসেন। এর পর ঘাতক মোবারক তাদের বাসা থেকে ৪টি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ এবং মোবাইল ও ল্যাপটপের চার্জার নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘাতক মোবারককে সোমবার রাতে নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মোবারক এমন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে মঙ্গলবার দুপুরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কুমিল্লা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খাঁন।
গ্রেফতার ঘাতক মোবারক হোসেন (২৯) জেলার দেবীদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে। তিনি কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার কাজী বাড়িতে বসবাস করতেন এবং নগরীর বাবুস সালাম জমিরিয়া মাদ্রাসা ও জামে মসজিদের খাদেম, পাশাপাশি তিনি ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি ব্যবসা করেন। ঘটনার পর ঢাকার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার ঘাতক মোবারক হোসেনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান সাংবাদিকদের জানান, নিহত ছাত্রী রিনথির মা ফাতেমা নগরীর বাবুস সালাম জামে মসজিদের খতিব ইলিয়াস হুজুরের কাছে মাঝেমধ্যে ঝাড়ফুঁকের জন্য যেতেন। সেখানে ওই মসজিদের খাদেম মোবারক হোসেনের সাথে পরিচয় হয়। মোবারক নিজেও ঝাড়ফুঁকসহ কবিরাজি করেন বলে ফাতেমাকে নিশ্চিত করেন। সেই সূত্র ধরে গত একমাস ধরে ফাতেমাদের বাসায় মোবারকের যাতায়াত ছিল। গত রবিবার ফাতেমা তার মেয়ের দেহের জিন তাড়ানোর জন্য কথিত কবিরাজ মোবারককে বাসায় ডাকেন। এসময় মোবারক মেয়ে রিনথির কক্ষে কথিত জিন তাড়ানোর জন্য যান। একপর্যায়ে কবিরাজ মোবারক রিনথিকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে রিনথির মা ফাতেমা টের পেয়ে তার মেয়েকে বাঁচাতে যান। এসময় মোবারক রিনথিকে তার কক্ষে দরজা বন্ধ করে আটকে রেখে রিনথির মা ফাতেমাকে তার কক্ষে নিয়ে বালিশ চাপা দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে রিনথির কক্ষে গিয়ে তাকেও গলাটিপে শ^াসরোধ করে হত্যা করে। এরপর তাদের বাসায় থাকা ৪টি মোবাইল ফোন, একটি ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপের চার্জার নিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনার পর পুলিশের একাধিক ইউনিট ঘটনার রহস্য উদঘাটনে পুরোদমে কাজ শুরু করে। ঘটনাস্থলের পাশের একটি স্কুলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করে মূলহোতা মোবারককে সনাক্ত করা হয় এবং সোমবার রাতে ট্রেনে করে ঢাকায় যাওয়ার জন্য রওনা হলে ডিবি পুলিশের একটি দল তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিকভাবে দুটি হত্যাকা- একজনই সংঘটিত করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে আমাদের তদন্ত অব্যাহত আছে। ঘটনার সাথে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নে পুলিশ জানায়, রিনথিকে অচেতন করে ধর্ষণের চেষ্টা কিংবা তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে কিনা তা মেডিকেল রিপোর্টের মাধ্যমে জানা যাবে।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মহিনুল ইসলাম জানান, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য গ্রেফতার আসামি মোবারক হোসেনকে আদালতে তোলা হয়।
এদিকে কুবি ছাত্রী রিনথি ও তার মায়ের হত্যার প্রতিবাদ ও হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মঙ্গলবারও কুবির শিক্ষার্থীরা জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের প্রধান ফটকে রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে অবস্থান ও বিক্ষোভ করে। পরে পুলিশ সুপার রিনথি ও তার মায়ের মূল ঘাতককে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করলে এবং এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আশ^স্ত করলে তারা কর্মসূচি তুলে নেয়।
এর আগে গত সোমবার সকালে কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে তাহমিনা বেগম ওরফে ফাতেমা ও তার মেয়ে সুমাইয়া আফরিন ওরফে রিনথির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রিনথি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় নিহত রিনথির ভাই তাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সোমবার রাতে অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।



