মাঝখানে তিন বিঘা ঘেরে মাছ, আর সেই ঘেরের চারপাশের পাড়ে চাষ হচ্ছে-লাউ, বেগুণ, ঢেড়শ, শশা, কুশি, উচ্ছে, ঝিঙ্গে, মিষ্টি কুমড়াসহ নানান ধরনের সবজি। ঘেরের পানিতে মাছের ছোটাছুটি আর পাড়ের সবুজ সবজি খেত দেখলে চোখ, মন জুড়িয়ে যায়। এটা সত্যজিৎ রায়ের সিনেমার কোনো দৃশ্য নয়, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ খুলনার উপকূলীয় দাকোপ উপজেলার তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের চরডাঙ্গা গ্রামের গৃহবধূ সুচিত্রা রায়ের (৫০) দীর্ঘ তিন বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সবজি খেত।
জেলা শহর খুলনা থেকে বটিয়াঘাটা উপজেলার ঝপঝপিয়া নদী পার হলেই দাকোপ উপজেলা। ঝপঝপিয়া নদীর ফেরি পার হয়ে পিচঢালা সুন্দর পাকা রোড ধরে দাকোপ উপজেলা সদর চালনার দিক দু-তিন কিলোমিটার এগুনোর পর ডান দিকে চলে গেছে দশ ফুট চওড়া পাকা রাস্তা। এই রাস্তা ধরে দু-তিন কিলোমিটার গেলেই তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের চরডাঙ্গা গ্রাম। এই গ্রামে ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষের সঙ্গে। চোখে-মুখে তাদের হাসির ঝিলিক। কষ্টের দিন পার করে শাকসবজি আর মাছ চাষ করে তারা এখন স্বাবলম্বী।
চরডাঙ্গা গ্রামের নারী কৃষক সুচিত্রা রায় (৫০) জানান, মাত্র তিন-চার বছর আগেও তারা হতদরিদ্র ছিলেন। স্বামী, এক ছেলে ও তাকে নিয়ে তিনজনের সংসার চলত খুবই কষ্টে। স্বামী প্রভাষ রায় সংসার চালানোর ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে খুলনা শহর সংলগ্ন বটিয়াঘাটা উপজেলার কৈয়া বাজারে চলে যেতেন কাজ করতে। সন্ধ্যায় দু-তিনশ টাকা নিয়ে আসলে সেই টাকা দিয়েই চলত তাদের কষ্টের সংসার। কোনো দিন খেয়ে, কোনো দিন না খেয়ে থাকতে হতো। বিয়ের পর থেকেই এভাবেই চলছিল তার দিন। তিন বছর আগে জাগ্রত যুব সংঘের (জেজেএস) সদস্যরা এসে তাদের শাক-সবজি চাষের জন্য উৎসাহিত করেন। আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ৩ বিঘা জমি প্রতি বছর ১০ হাজার টাকা চুক্তিতে হারি (লিজ) নেন। এই জমির মাঝখানে মাছের ঘের করেন। আর সেই ঘেরের চারপাশে শুরু করেন লাউ, বেগুণ, ঢেড়শ, শশা, কুশি, উচ্ছে, ঝিঙ্গে, মিষ্টি কুমড়াসহ নানান ধরনের সবজি চাষ। প্রতি মৌসুমে সবজি উৎপাদনে তার খরচ হয় ৬০ হাজার টাকা। আর সেই সবজি বিক্রি হয় ২ লাখ টাকায়। মাছ বিক্রি হলে আয় হয় আরো বেশি টাকা। হারির টাকা ও খরচ-খরচা বাদে দেড় লাখ টাকার মতো লাভ থাকে। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে খুব ভালো আছি। সংসারে অভাব নেই। সচ্ছলভাবেই বেঁচে আছি।
সুচিত্রা রায়ের ঘেরের পাশেই আরেক নারী কৃষক শিখা রায়ের (৪৫) দেড় বিঘার সবজি খেত। স্বামী সুকুমার রায় আর দুই ছেলে-মেয়ে নিয়ে তারও সুখের সংসার।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও আমার সংসারে খুবই কষ্ট ছিল। অন্যের জমি হারি নিয়ে এখন আমি স্বাবলম্বী হয়েছি। পরিবার নিয়ে সুখেই কাটছে দিন।
সুচিত্রা রায়, শিখা রায়, শিল্পী ম-ল, স্বপ্না রায়সহ চরডাঙ্গা গ্রামের আড়াই শতাধিক নারী-পুরুষ এখন মাছের ঘেরের পাশাপাশি সবজি চাষের সঙ্গে জড়িত হয়ে স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাদের সংসারে অভাব নেই। আছে সুখ আর শান্তি।
তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান জালালউদ্দিন গাজী বলেন, মাত্র তিন-চার বছর আগেও চরডাঙ্গা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ হতদরিদ্র ছিল। নারীরা ঘরের কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ করত না। এখন সেই নারীরা সবজিচাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছে।
তিনি বলেন, চরডাঙ্গা গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের সনাতন ধর্মের নারী-পুরুষরা সবজিখেত করে স্বাবলম্বী হলেও মুসলমান নারী-পুরুষদের এদিকে আগ্রহ খুবই কম। যদি মুসলমান নারী-পুরুষরাও সবজি খেত করে চাষাবাদ করতো তাহলে পুরো গ্রামের লোকজনই স্বাবলম্বী হয়ে যেত।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেন বলেন, ‘উপকূলীয় বাসিন্দাদের সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং খুলনা জেলার অতিদরিদ্র পরিবারগুলোর আয় উন্নয়ন (ইআরসিসি-২) প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা দাকোপ ও কয়রা উপজেলার জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার পরিবারকে নিয়ে কাজ করছি। জলবায়ু পরিবর্তনে খাপ খাইয়ে তারা যাতে কৃষি, মৎস্য, পশুপালন করে তাদের জীবিকা উন্নয়ন ও আয় বাড়িয়ে টিকে থাকতে পারে আমরা সেই চেষ্টা চালাচ্ছি। দ্বিতীয় ধাপের এই প্রকল্পে চরডাঙ্গা গ্রামের আড়াই থেকে তিন শতাধিক অতিদরিদ্র নারী-পুরুষ স্বাবলম্বী হয়েছে।
দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, দাকোপ উপজেলায় পাঁচ-ছয়টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা দরিদ্র কৃষকদের উৎপাদনমুখী করতে কাজ করছে, তাদের মধ্যে জেজেএস অন্যতম। তবে দাকোপের মানুষদের মূল সমস্যা হচ্ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। তারা উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী নিজেরা বাজারজাত করতে পারে না। বাইরে থেকে কোনো ব্যবসায়ী এসে কিনলে তবেই তাদের পণ্য বিক্রি করতে পারে। এছাড়াও অন্য আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে, পানখালীর খেয়া ঘাট। এখানে ফেরি পারাপার যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ দিতে হয় ফেরির কর্মচারীদের বখশিশ। এই সমস্যা নিরসন করা না হলে এখানকার কৃষকদের কৃষি উৎপাদনে ব্যাপকভাবে কৃষি উৎপাদনে উৎসাহিত করা যাবে না।
মাছ আর ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ করে স্বাবলম্বী
Recent Comments
on Hello world!


