আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে বাংলাদেশ থেকে ১০ বছরে (২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত) প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (৬৮.৩ বিলিয়ন) বিদেশে পাচার হয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) প্রকাশিত তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের মূল্য বা পরিমাণের মিথ্যা তথ্য দেওয়ার মাধ্যমে (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরানো হয়েছে। মূলত কর ফাঁকি দেওয়া, মুনাফা স্থানান্তর বা বিদেশে পুঁজি পাচারের উদ্দেশ্যে আমদানিতে অতিরিক্ত মূল্য (ওভার ইনভয়েসিং) এবং রপ্তানিতে কম মূল্য (আন্ডার ইনভয়েসিং) দেখানোর এই কারসাজি করা হয়।
জিএফআই-এর তথ্যমতে, বাণিজ্য মূল্যের এই বিশাল ব্যবধানের দিক থেকে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষ ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের এই অবৈধ অর্থ প্রবাহের একটি বড় অংশ উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের সময় ঘটেছে। মোট ঘাটতির মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ কোটি ডলার বা ৩৩ বিলিয়ন ডলারের কারসাজি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে।
প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের এই ঝুঁকি কেবল আঞ্চলিক বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী খাত এবং আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোতে এই ধরনের অর্থ পাচারের প্রবণতা বেশি দেখা গেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের এই ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হলেও ভারতের তুলনায় তা অনেক কম। একই সময়ে ভারত থেকে বাণিজ্যের আড়ালে রেকর্ড ১ লাখ ৬ হাজার কোটি (১.০৬ ট্রিলিয়ন) ডলার পাচার হয়েছে।
অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কায় উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে শ্রীলঙ্কার ভঙ্গুর অর্থনীতির প্রেক্ষিতে এই পাচারের প্রভাব দেশটিতে অনেক বেশি ভয়াবহ।
পুরো এশিয়া অঞ্চলের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল ২০২২ সালেই এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে বাণিজ্যের আড়ালে পাচার হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার কোটি ডলার।
চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতিগুলো এই তালিকায় শীর্ষে থাকলেও ছোট-বড় সব দেশেই এই সমস্যা প্রকট আকারে বিদ্যমান। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, এশীয় অর্থনীতিগুলোতে এ ধরনের অনৈতিক চর্চা গভীরভাবে গেড়ে বসেছে। গত এক দশকে এই প্রবণতা হ্রাসের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
এশিয়া বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর একটি হলেও, এই অঞ্চলে অবৈধ অর্থপ্রবাহ বা অর্থ পাচার একটি গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। এশিয়া থেকে প্রতিবছর শত বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে পাচার হয়ে যাচ্ছে, যা উন্নয়ন, কর রাজস্ব এবং সুশাসনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
এশিয়ায় অর্থ পাচারের পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। যেমন দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। অনেক দেশে দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং জবাবদিহিতার অভাব পাচারকারীদের সুযোগ করে দেয়। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এর মধ্যে অন্যতম।
অফশোর ব্যাংকিং, শেল কোম্পানি এবং গোপনীয়তা আইনের কারণে পাচারকৃত অর্থ সহজেই গন্তব্যে পৌঁছে যায়। কর ফাঁকি ও কর পরিহারের সুযোগ থাকায় অনেক প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থ বিদেশে সরিয়ে নেয়। উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি পাচার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে।


