তেইশ শীর্ষ সন্ত্রাসীর টিটনকে গুলি করে হত্যা


রাজধানীর নিউমার্কেটে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের গুলিতে তেইশ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন ওরফে টিটন নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত ৮ টার দিকে নিউমার্কেটের কাঁচাবাজারে প্রবেশ সড়কের বটতলার সামনে এ ঘটনা ঘটে। নিহত টিটনের বয়স ৬০ বছর।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, একজন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত খুব কাছ থেকে মাথা সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫ থেকে ৬ টি গুলি একটি মোটর সাইকেলে করে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা রাত ৮ টা ২৭ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, টিটন ২৩শীর্ষ সস্ত্রাসীদের অন্যতম একজন। ২০২৪ সালের ৫ আগষ্টের পর কারাগার থেকে টিটন মুক্তি পায়। মুক্তি পাওয়ার পর টিটন আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হয়। নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকায় চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রন নিয়ে এ খুনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে পুলিশের ধারনা। এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে দুর্বৃত্তদের ধরতে পুলিশ রাতেই ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় সাড়াশি অভিযান শুরু করে।

এর আগে ২০০১ সালের ২৬ ডিসেম্বর তৎকালীন সরকার রাজধানীর ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামের তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় টিটনের নাম ২ নম্বরে তালিকাভ‚ক্ত ছিল। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ২০০৪ সালের ১৫ ফেব্রæয়ারি ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকার একটি বাসা থেকে পিস্তলসহ গ্রেফতার করে। একই বছরের এডভোকেট বাবর এলাহী হত্যা মামলায় টিটনকে মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে আদালত।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সাপ্তাহিক ছুটির দিন হিসাবে গতকাল মঙ্গলবার নিউমার্কেট বন্ধ ছিল। রাত রাত ৮ টার দিকে টিটন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ নেওয়াজ হলের সামনের রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন।

নিউমার্কেট কাঁচাবাজারে প্রবেশ সড়কমুখে বটতলার কাছে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেলের পেছনের সিটে বসা আরোহী মোটরসাইকেল থেকে নেমে তাকে লক্ষ্য করে পরপর ৩ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে।

ওই র্দ্বুৃত্ত বিজিবির ৩ নম্বর গেটের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পথচারীরা তাকে ধাওয়া দেয়। এসময় ওই দুর্বৃত্ত ফাঁকা এক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। দুর্বৃত্ত দৌড়ে মোটরসাইকেলের পিছনের সিটে ওঠার পর দ্রæতবেগে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়।

একজন প্রত্যক্ষদর্শী কলেজ ছাত্র তাহাসিন বলেন, পেছন দিক থেকে মাক্স পরিহিত একটি যুবক প্রথমে তাকে লক্ষ করে দুটি গুলি ছুড়ে। পরে আবার দৌড় তার কাছে গিয়ে আরও দুটি গুলি করে। এতে তিনি পরে যান। পরে আবার তার সামনে গিয়ে মাথায় ঠিকে গুলি করে।

লোকজন চিৎকার দিলে ওই দুর্বৃত্ত আরেকটি ফাঁকা গুলি করে দৌড়ে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে পালিয়ে যায়। পরে আশপাশের লোকজনের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসি। হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ কমিশনার মাসুদ আলম বলেন, ‘নিহত ব্যক্তি শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ তথ্য জানা যায়। রাত ৮টার দিকে নিউ মার্কেটের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাহনেওয়াজ হলের সামনের বটতলা এলাকায় মাস্ক পরিহিত দুজন মোটরসাইকেল আরোহী এসে তাকে গুলি করে হত্যা করে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।

জানতে চাইলে ঘটনাস্তল পরিদর্শনকারী নিউমার্কেট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাহাদাত বলেন, সন্ত্রাসীরা মোটরসাইকেলে এসে খুব কাছ থেকে টিটনের মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫ থেকে ৬ টি গুলি করে পালিয়ে যায়। আহত অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮ টা ২৭ মিনিটে তাকে ঘোষণা করেন। তার বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। তার লাশ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত চলছে।

২০০১ সালে সরকার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকার ২ নম্বরে টিটনের নাম ছিল। তার ভগ্নিপতি আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন। তারা দুজনই মোহাম্মদপুরের ‘ সন্ত্রাসী চক্র’ হারিছ-জোসেফ গ্রæপে যুক্ত ছিলেন। ধানমÐি ও হাজারীবাগ এলাকায় টিনের তৎপরতা ছিল। ৫ আগষ্টের পর জেল থেকে ইমন মুক্তি পেয়ে ব্যাংকক পাড়ি জমান। ব্যাংকক থেকে ইমন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রন করছেন।

পুলিশ বলছে, টিটনের পিতার নাম কে এম ফখরুদ্দিন। মায়ের নাম আকলিমা বেগম। তিনি হাজারীবাগ জিগাতলা এলাকায় ২৩০/১ (সুলতানগঞ্জ) পরিবারের সঙ্গে থাকতেন।

নিউ মার্কেট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, রাত ৮টার দিকে নিউ মার্কেটের পাশে বটতলা এলাকায় গিয়ে অনেক রক্ত দেখতে পাই। পরে জানতে পারি শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন এখানে খুন হয়েছে।

প্রসঙ্গত এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর বেলা পৌনে ১১টার দিকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের এক সময়ের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাঈফ মামুনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, এই হত্যার নেপথ্যে ছিলেন নাঈম আহমেদ টিটনের ভগ্নিপতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন।

পুলিশ জানায়, টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে সন্ত্রাসী জগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন। এরপর ধীরে ধীরে অপরাধ জগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিটন তার অপরাধ কার্যক্রম বিস্তৃত করেন। তিনি একাধিক হত্যাকাÐের নেতৃত্ব দেন।

টিটন অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।

এর আগে ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদÐপ্রাপ্ত হন। এরপর ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments