রাজশাহীর বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. তসিকুল ইসলাম রাজা আর নেই

রাজশাহী শাহ্ মখদুম ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের ও রাজশাহী লেখক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ড. তসিকুল ইসলাম রাজা আর নেই। সোমবার (১৮ মে) দিবাগত রাত ৮টার দিকে রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

পরিবার সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন তিনি। অসুস্থ অবস্থায় তিনি ঢাকায় ছেলের বাসায় অবস্থান করছিলেন। মৃত্যুকালে তিনি ১ ছেলে, ১ মেয়ে, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী, শুভাকাঙ্ক্ষী ও শিক্ষার্থী রেখে যান।

স্বজনেরা জানান, মরহুমের মেয়ে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। তিনি মঙ্গলবার রাতে দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এ কারণে ড. রাজার মরদেহ বারডেম হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়েছে। বুধবার মরদেহ রাজশাহীতে আনা হবে। এদিন বাদ আসর জানাযার নামাজ শেষে তাকে নগরীর মহিষবাথান কবরস্থানে দাফন করা হবে।

ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ছিলেন একজন প্রতিবাদী কবি, নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। আধুনিক বাংলা কবিতা, লোকসংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক ইতিহাস-ঐতিহ্য গবেষণায় তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে তিনি একজন নিরলস কর্মী ও মুক্তবুদ্ধির চর্চক হিসেবে সারাদেশে সুপরিচিত ছিলেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও বেশি।

শতাধিক গবেষণামূলক প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে তার। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হচ্ছে, ‘বাসর ফেলে যুদ্ধে আয়, নেই রক্ষা নেই, রবীন্দ্রোত্তর বাংলাকাব্যে গ্রামীণ জীবন, রবীন্দ্রনাথের লোকায়ত জীবন ও সংস্কৃতি ভাবনা, বাংলাদেশে লোকসংস্কৃতি চর্চার ইতিবৃত্ত ও অন্যান্য প্রবন্ধ, মনীষী ও গুণিজন স্মরণে, নির্বাচিত প্রবন্ধ, ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, আমার লোকসংস্কৃতি ভাবনা, রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলন, বরেন্দ্র অঞ্চলে ভাষা আন্দোলন, বরেন্দ্র অঞ্চলের ইতিহাস, বাংলাদেশ এবং বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি।’

সাহিত্য, গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পুরস্কারে ভূষিত হন। এর মধ্যে রয়েছে কবি বন্দে আলী মিয়া সাহিত্য পদক (১৯৯৫), জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর স্বীকৃতি, নলতা কচি-কাঁচার মেলা সাহিত্য স্বর্ণপদক (২০০৯), কবিকুঞ্জ পদক (২০১৩), ঋত্বিক ঘটক সম্মাননা পদক (২০১৮), অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় সম্মাননা পদক (২০১৯), বাংলা একাডেমির সা’দাত আলী আকন্দ সাহিত্য পুরস্কার (২০২১) এবং রাজশাহী জেলা শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা পুরস্কার ও পদক (২০২২)।

তিনি বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ইতিহাস ও সংস্কৃতি গবেষণা পরিষদের আজীবন সদস্য ছিলেন। ড. তসিকুল ইসলাম রাজা ১৯৫৩ সালের ১১ জানুয়ারি রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বালিয়াঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজশাহী কলেজ থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক (সম্মান) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পর ভারত সরকারের বৃত্তি নিয়ে কলকাতার রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাকাব্যে গ্রামীণ জীবন’।

শিক্ষকতা জীবনে তিনি ১৯৮৩ সালে রাজশাহী মহানগরীর শাহ্ মখদুম ডিগ্রি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি অধ্যক্ষ পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাজ্জাদ আলীর পুত্র। তার স্ত্রী হোসনে আরা বেগম ডেইজী। কন্যা ফাতিমাতুজ জোহরা সেঁওতি ও পুত্র সাফিন ইসলাম। এছাড়া তিনি জামাতা আরিফুর রহমান জনি, পুত্রবধূ রওনক জাহান নিতু এবং দুই নাতি অদ্রিক ও অরিত্রকে রেখে যান।

ড. তসিকুল ইসলাম রাজার মৃত্যুতে ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু এমপি, রাজশাহী-৩ আসনের এমপি সফিকুল হক মিলন, রাজশাহী জেলা পরিষদের প্রশাসক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এরশাদ আলী ঈশা ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments