রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ দেশের মানুষ। এমন জঘন্যতম নৃশংসতার দৃষ্টান্তম‚লক বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষ। গতকাল হস্পতিবার সকালে পল্লবীতে রামিসার বাসার সামনে বিক্ষোভ করে সহপাঠী এবং এলাকাবাসী। এ সময় দ্রæত বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানান তারা।

এলাকাবাসী ও সহপাঠীরা পল্লবী থানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে থানার ভেতরে ঢুকে পড়েন তারা। রামিসা হত্যাকান্ডের প্রধান আসামি সোহেল রানাকে কারাগারে না রেখে দ্রæত বিচারের মাধ্যমে ফাঁসির দাবি জানান তারা। অভিযুক্ত সোহেলসহ অপরাধীদের দ্রæততম সময়ে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল ছিল পল্লবী এলাকা।বিক্ষোভে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন। তারা অপরাধীর দ্রæত বিচার ও নিরাপত্তার দাবিতে বিভিন্ন ধরনের ¯েøাগানসম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। তারা বলছেন, এ ঘটনা সাধারণ কোনো অপরাধ নয়, জঘন্য হত্যাকাÐ।
দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ার পরিবর্তে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রæততম সময়ে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান তারা। দুপুরে দেড়টার দিকে রামিসার বাসার সামনে গিয়ে দেখা যায় তখনো বিক্ষোভ চলছে। সেখানে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা শিল্পী বেগমের (৩৮) সঙ্গে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা দ্রæততম সময়ে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই যেন এ ধরনের জঘন্য কাজ করার সাহস আর কেউ না পায়।’বিক্ষোভের সামনে নিজের ৪ বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন রিয়া মনি। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন ঘরে-বাইরে কোথাও আমাদের সন্তানদের নিয়ে নিরাপদ বোধ করছি না।
আশপাশের সবার ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে গেছে।’‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনের দুর্বলতার কারণেই আজ আমাদের এই নিরাপত্তাহীনতা,’ যোগ করেন তিনি।

মিরপুর ১০ নম্বর এলাকার বাসিন্দা সোনিয়া আক্তার নূপুর বলেন, ‘এলাকায় মাদকের প্রসারের কারণে ধর্ষণ ও হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে। ‘এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা ও মাদকসেবীদের উৎপাত মারাত্মকভাবে বেড়েছে। এরাই পারে শিশুদের সঙ্গে এমন জঘন্য কাজ করতে।হত্যাকারী দোষ স্বীকার করায় আইনি জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগ নেই।
আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে যেন হত্যতাকারী পার না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে,’ বলেন তিনি।আরেক অভিভাবক নাজনীন ইসলাম বলেন, ‘রামিসার মতো ছোট মেয়ে আমারও আছে। একটা শিশুকে এভাবে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার চেয়ে নৃশংস আর কী হতে পারে? হত্যাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’আসামির গ্রেপ্তারেই তারা সন্তুষ্ট নন, বরং সমাজ থেকে এই অপরাধীদের নির্মূল করতে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও সক্রিয় করার দাবি জানাচ্ছেন তারা।বৃহস্পতিবার শতশত মানুষ পল্লবী থানার সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন।
বিক্ষোভরতদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লাবলেন, ‘আমি কাউকে এখানে ডেকে আনিনি। সাধারণ মানুষ নিজেদের তাড়না থেকেই আমার মেয়ের জন্য বিচার চাইতে এসেছেন।’স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বিএনপির সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা তুলি সেখানে গিয়ে তাদের সান্ত¡না দিয়েছেন এবং দ্রæততম সময়ের মধ্যে এই হত্যাকাÐের বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে জানান হান্নান মোল্লা।
সংক্ষিপ্ত সময়ে দৃষ্টান্তমূলক বিচার সম্পন্ন হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই আশ্বাস দেন।
গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে পাল্টা প্রশ্ন রেখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা দায়িত্বে আসার পর, এ পর্যন্ত যতগুলো এই জাতীয় হেনিয়াস ক্রাইম (গুরুতর অপরাধ) হয়েছে, আপনারা কি কেউ একটা ক্রাইমের ক্ষেত্রেও বলতে পারবেন যে, পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করেনি এবং সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতরে তারা অ্যারেস্ট করতে পারেনি? একটাও নেই। আমার কাছে সবগুলোর তালিকা আছে। যদি তার ব্যত্যয় কিছু হয়ে থাকে, আপনারা প্রশ্ন তুলতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘রামিসার ব্যাপারেও ২৪ ঘণ্টার ভেতরে আসামি গ্রেফতার হয়েছে। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। আমরা এটুকু আশ্বাস দিতে পারি, আমাদের পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত সময়ের ভেতরে সুষ্ঠু তদন্ত করে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে। বিচারের দায়িত্ব আদালতের।’
ঢাকার পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সমাজের বিভিন্ন মহল থেকে প্রতিবাদ আসছে, যেখানে এ ঘটনাকে ‘সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি’ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। গতকাল ঢাকায় এ ঘটনার বিচার চেয়ে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি আসে রাজনীতিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশা থেকে।
বৃহস্পতিবার ‘অভিভাবক ও শিক্ষার্থী নেটওয়ার্ক’ ব্যানারে মানববন্ধন হয় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আজিমপুর ক্যাম্পাসের ফটকে।এতে বক্তব্য রাখেন অভিভাবক মুসলিম বিন হাই, শিশু কিশোর মেলার সংগঠক পংকজনাথ সূর্য, ইডেন কলেজের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাইনা ও খাদিজা রহমান কবিতা।
বক্তারা বলেন, ধর্ষণ ও শিশু হত্যার মতো নৃশংস ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ বড় ভ‚মিকা রাখছে।ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিবৃতি দিয়েছে ‘সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি’। নারী এবং মানবাধিকার ও উন্নয়ন বিষয়ক ৭১ সংগঠনের এই প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে ফওজিয়া মোসলেম এ বিবৃতি পাঠান।পৃথক এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ‘বিশিষ্ট কয়েকজন নাগরিক’।

বৃহস্পতিবার সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা, দমনপীড়ন ও জনজীবনে অনিরাপত্তার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি।এতে বলা হয়, গত সাত দিনে চারজন কন্যা শিশু ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে।
এসব ঘটনা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার সুস্পস্ট প্রতিফলন।সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি এসব সহিংস ঘটনা জনমনে আতঙ্কের পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহ যোগাবে।বিবৃতিদাতার তালিকায় সুলতানা কামাল, রাশেদা কে চৌধুরী, রামেন্দু মজুমদার, ডা. আলী, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, খুশী কবির, নূর মোহাম্মদ তালুকদার এবং এম এম আকাশের নাম রয়েছে।
হত্যাকারীদের দ্রæত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর উত্তরের মহিলা বিভাগ। এ সময় রামিসা হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রæত ফাঁসির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি জানান বক্তারা।
রাজধানীর বাইরেও দেশের বিভন্ন এলাকায় শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে সর্বস্তরের মানুষ। রামিসার গ্রামের বাড়ি শেরপুরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আজকের তারুণ্যের ব্যানারেও অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবি তোলা হয়।
রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় বিচার চেয়ে সোচ্চার হয়েছেন বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন। ফেসবুকে ওই শিশুর একটি স্কেচ ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ‘আমরা এমন এক সমাজ চাই, যেখানে প্রতিটি শিশু নিরাপদে হাসতে পারবে; ভয় নয়, স্বপ্ন নিয়ে বড় হবে। আর কোনো…জীবন যেন এভাবে থেমে না যায়।
আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন, আর দোষীদের এমন শাস্তি হোক, যা সমাজের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে।’বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ১০০ টেস্ট খেলা মুশফিকুর রহিমও নৃশংস এ ঘটনার বিচার চেয়েছেন ফেসবুকে। তার ভেরিফায়েড পেজ থেকে একটি গ্রাফিকস ছবি পোস্ট করা হয়। সেই ছবির ওপরে লেখা, ‘আমরা…জন্য বিচার চাই।’ বাংলাদেশের টি-টুয়েন্টি অধিনায়ক লিটন দাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে করা পোস্টে লেখা হয়, ‘কন্যাসন্তানের বাবা হিসেবে…খবরটি শোনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং মর্মন্তুদ।’বিসিবির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি তামিম ইকবালও ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গ্রাফিকস ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, ‘…জন্য বিচার চাই।’
স¤প্রতি দেশে শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে। আসক বলছে, পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকাÐসহ সা¤প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ওই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।আসক মনে করে, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সামাজিক জবাবদিহির সংকটের প্রতিফলন।আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণ পরবর্তী এবং ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাÐের শিকার হয়।



