ঢাকার কেরাণীগঞ্জে বাড়ি সবুজ হোসেন হাওলাদারের। ঢাকায় চাকরি সূত্রে মোটরসাইকেলে করে অফিস যাতায়াত করেন। সোমবার সকালে তার মোবাইল ফোনে একটি দীর্ঘ ম্যাসেজ আসে। মাসেজে লেখা আছে, ‘ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করায় আপনার বিরুদ্ধে বিজ্ঞ আদালতে সিআর-১৩১/২৬ মামলা দায়ের হয়েছে। আগামী ২.০৬.২০২৬ তারিখ নি¤œ ঠিকানায় হাজির থাকার নির্দেশ করা হলো নয়ত আপনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি হবে। স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-ঢকেশ্বরী মন্দিরের কাছে ফায়ার সার্ভিসের উল্টো দিকে-লালবাগ-ঢাকা।’
এই ম্যাসেজ পেয়ে তিনি সংশ্লিষ্ট ডিএমপির লালবাগ ট্রাফিক বিভাগে যোগাযোগ করে জানতে পারেন যে ম্যাসেজটি ভুয়া। প্রতারক চক্র এআইয়ের মামলা দেয়ার নামে ম্যাসেজ পাঠিয়ে গাড়ির মালিক ও চালকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছে।
এআই মামলা নিয়ে এ ধরনের প্রতারক চক্র থেকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এন এম নাসিরুদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ইদানিং ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক ধার্যকৃত জরিমানা আদায়ের বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নগরবাসী এসএমএস পাচ্ছেন। তবে এসব বার্তার সঙ্গে ডিএমপির কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
এদিকে, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, স্বয়ংক্রিয় বাতির সিগন্যাল দু একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছাড়া অনেক চালকই মানেন না। আবার ট্রাফিক সদস্যদের হাতের ইশারাকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান। এসব ঘটনা বিবেচনা করে এবার এআই পদ্ধতিতে মামলার সিদ্ধান্ত নিলো ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ।
একজন প্রাইভেট কার চালক (তিনিই গাড়ির মালিক) জানান, পাঁচ দিন আগে তিনি কাওরানবাজার মোড়ে রাত ২ টার দিকে ট্রাফিক সিগন্যালের লাল বাতি অমান্য করেই চলে গিয়েছিলেন। এর ঘন্টা দুয়েক পর মোবাইল ফোনে নিয়ম ভাঙার বার্তা পান গাড়িটির মালিক। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাকে জরিমানা করা হয় ২ হাজার টাকা। গাড়িটি শনাক্ত করা হয়েছিল সড়কে বসানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত ক্যামেরার মাধ্যমে। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালান।
তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকেই পোস্ট দিয়ে বলছেন, গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের অনেকে এরইমধ্যে এআই ক্যামেরাকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় খুঁজে পেয়েছেন। অনেক বাইকের নম্বর প্লেট থেকে দু একটি নম্বর মুছে ফেলেছেন, কেউ নম্বর প্লেট কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছেন। মামলা এড়াতে এভাবে নানা কৌশলও লক্ষ্য করা গেছে।
গত মাসে রাজধানীর ট্রাফিক ক্যামেরাগুলোকে এআই সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করা শুরু করে পুলিশ। এই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করা গাড়ি শনাক্ত করতে সক্ষম। এআই ব্যবস্থাটি মূলত রাস্তায় থাকা বর্তমান ট্রাফিক মনিটরিং ক্যামেরার লাইভ ফিড ব্যবহার করে কাজ করে। সিগন্যাল অমান্য করা, লেন ভাঙা থেকে শুরু করে অবৈধ পার্কিংয়ের মতো বিভিন্ন অপরাধ এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হয়।
পুলিশ বলছে, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে এআই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ ফিডগুলো পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সেখানে সফটওয়্যার কর্তৃক চিহ্নিত ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যাচাই করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, একদিনেই এই সিস্টেমে প্রায় ৮০০টি ট্রাফিক নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। আপাতত পুলিশ গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে জরিমানা করছে। বাকিদের সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন, এই প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এখনো বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা আছে।
কিছু গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট অথবা এত ছোট যে তা ঠিকভাবে চেনা বা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য পুলিশ বর্তমানে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। এর পাশাপাশি ফুটপাতে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালিয়ে যাওয়ার মতো অপরাধগুলো শনাক্ত করতে শিগগিরই নতুন কিছু ফিচার যুক্ত করা হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক হাসিব মোহাম্মদ আহসান বলেন, এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য প্রযুক্তির চেয়েও বেশি নির্ভর করবে নিয়ম প্রয়োগের ওপর। অর্থ্যাৎ কর্তৃপক্ষ নিয়মগুলো কতটা ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করছে সেটির ওপর। ট্রাফিক সিগন্যাল ও সেগুলোর আধুনিকীকরণের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা হয়েছে। কিন্তু প্রচেষ্টাগুলো টেকসই হয়নি। বুয়েটের এই অধ্যাপক আরও বলেন, আমাদের মধ্যে আইন না মানার প্রবণতা আছে, পরিকল্পনায় কোনো ধারাবাহিকতা এমনকি ব্যর্থতার জন্য কারও কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
পুলিশের সতর্কতা : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাফিক জরিমানার নামে পাঠানো বিভিন্ন এসএমএসকে ‘সম্পূর্ণ বানোয়াট ও অসত্য’ বলে সতর্ক করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। নগরবাসীকে এ ধরনের বার্তায় বিভ্রান্ত বা প্রতারিত না হওয়ার আহŸান জানিয়েছে সংস্থাটি।
ডিএমপি জানায়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অমান্যকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে ট্রাফিক বিভাগ মামলা দিলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বা ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষরযুক্ত একটি পত্র যানবাহনের মালিকের ঠিকানায় পাঠানো হয়। এ ছাড়া কেবলমাত্র ০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর থেকে প্রয়োজনে এসএমএস পাঠানো হয়ে থাকে বলে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক জরিমানাকৃত যানবাহনের জরিমানা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপায় ও সিবিবিএলের মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। তবে কোনো অবস্থাতেই ডিএমপি নাগরিকদের কাছে পিনকোড, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি জানতে চায় না। ট্রাফিক এআই/ভিডিও মামলা সংক্রান্ত যেকোনো তথ্যের জন্য ডেল্টা-৩ শাখার ০১৩২০-০৪২২০৭ ও ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বরে অথবা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।



