মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ আর নেই। রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে আট মাস আট দিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না লিল্লাহি রাজিউন)। তার তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি এক মেয়েসহ অসংখ্য শুভানুধ্যায়ী, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা রেখে গেছেন। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন।

দেশের রাজনীতির নানা বাঁক-বদলের সাক্ষী তোফায়েল আহমেদ মাত্র ২৭ বছর বয়সে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ৯ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একাধিকবার মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃণম‚ল থেকে উঠে আসা এ রাজনীতিক আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীতে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদে।

তোফায়েল আহমেদ কয়েক বছর ধরেই হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। স্ট্রোকের কারণে তার শরীরের একাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়। বাঁ হাত ও পা অবশ হয়ে পড়ায় তিনি চলাফেরা অক্ষম হয়ে পড়েন। স্কয়ার হাসপাতালের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বর্ষীয়ান রাজনীতিক তোফায়েল দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিকালে নিউমোনিয়াজনিত শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও শারীরিক দুর্বলতা নিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. রায়হান রাব্বানীর তত্ত¡াবধানে চিকিৎসাধীন ছিলেন।সেখানেই তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন।

তোফায়েল আহমেদের একমাত্র মেয়ে তসলিমা আহমেদ জামান মুন্নী ও তাঁর স্বামী তৌহিদুজ্জামান তুহিন পেশায় চিকিৎসক। ম‚লত তারাই তোফায়েল আহমেদকে সার্বক্ষণিক দেখভাল করতেন। তোফায়েল আহমেদের পরিবারের কয়েকজন সদস্য জানান, প্রায় তিন বছর আগে প্রথম দফায় মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন বর্ষীয়ান এই নেতা। এরপর তিনি আরেক দফায় করোনা আক্রান্ত হন। সেই সঙ্গে কমপক্ষে দু’দফায় তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ঘটনা ঘটে।

একসময় তিনি স্মৃতিশক্তি হারান। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন, পরে অন্তর্র্বতী সরকারের দেশ পরিচালনা-এর কিছুই অনুধাবন করতে পারেননি তোফায়েল আহমেদ। কাউকে চিনতেও পারতেন না তিনি।

১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে তোফায়েল আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আজহার আলী। মায়ের নাম ফাতেমা খানম। তোফায়েল আহমেদ ভোলা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৬০ সালে তৎকালীন ম্যাট্রিকুলেশন পাসের পর ভর্তি হন বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে। সেখান থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি এবং ১৯৬৪ সালে বিএসসি সম্পন্ন করেন।

ব্রজমোহন কলেজে স্নাতক শেষে তোফায়েল আহমেদ ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে। এখান থেকে স্নাতকোত্তর করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ইকবাল হল (শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) ছাত্র সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক, পরের বছর মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহসভাপতি এবং ১৯৬৬-৬৭ শিক্ষাবর্ষে ইকবাল হল ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা কর্মস‚চি ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন তোফায়েল আহমেদ। অভ্যুত্থানের মুখে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রæয়ারি বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। পরদিন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে তোফায়েল আহমেদ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেন শেখ মুজিবুর রহমানকে। গণঅভ্যুত্থানেই আইয়ুব খানের পতন ঘটে, অবসান হয় মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থার।

উনসত্তরেই তোফায়েল আহমেদ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ডাকসুর ভিপি থাকাকালে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্যে আসেন। পরের বছরের ২ জুন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে তোফায়েল আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি শুরু করেন। সে বছর ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

মুজিবনগর সরকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম সংগঠক তোফায়েল আহমেদ স্বাধীনতার পর সংবিধান প্রণয়নে ভ‚মিকা রাখেন। ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তাকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব করে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি ওই পদে বহাল ছিলেন। এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে ভোলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ।

পঁচাত্তরের ২৫ জানুয়ারি দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার চালু হলে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ‘রাষ্ট্রপতির বিশেষ সহকারী’ নিযুক্ত হন তোফায়েল আহমেদ। সে বছরই বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠিত হলে এর যুব সংগঠন ‘জাতীয় যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরপরই তোফায়েলকে গৃহবন্দি করা হয়। পরে পুলিশ কন্ট্রোল রুম এবং রেডিও অফিসে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।

একই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারের কনডেম সেলে। পরে কুষ্টিয়া কারাগারে তাকে স্থানান্তর করা হয়। তখন দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারাগারে ছিলেন। কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯৭৮ সালে তোফায়েল আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করে সামরিক শাসনবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভ‚মিকা রাখেন।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে তোফায়েল আহমেদ শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং ২০১৪ সাল থেকে থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তোফায়েল আহমেদ নৌকা প্রতীক নিয়ে মোট ১২ বার নির্বাচন করেছেন। মাত্র ২৭ বছর বয়সে প্রথম ভোটে বিজয়ী এ রাজনীতিক ৮০ বছর বয়সেও জয়ের মুখে দেখেছেন।

২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকেই জয় পান। সবমিলিয়ে তিনি নয়বার এমপি হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে, ১৯৭০-এ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদ, ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন। রাজনীতির নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে তোফায়েল ১৯৯২ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন, যে পদে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৮ বছর।

সংবিধান থেকে ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ অপসারণ, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার এবং মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তোফায়েল আহমেদ ২০১০ সালে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য হন, যে পদেই ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে ভোলায় দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ভাঙচুর, অস্ত্র প্রদর্শন ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ এনে মামলা হয়। বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) তাঁর ব্যাংক হিসাব স্থগিত করে।

জেপি’র শোক: ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অগ্রসৈনিক ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টি-জেপি’র চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও মহাসচিব শেখ শহীদুল ইসলাম। গতকাল এক শোক বার্তায় জেপি নেতৃদ্বয় বলেন, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে জাতি একজন প্রবীন রাজনীতিবিদ, শীর্ষ পার্লামেন্টারিয়ান ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে হারালো। জেপি নেতৃদ্বয় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

জাসদের শোক: তোফায়েল আহমেদের মৃত্যুতে গভীর শোক এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার-স্বজন-সহযোদ্ধা- গুনাগ্রহীদের আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যকারী কমিটি। দলের পক্ষ থেকে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধে অগ্রণী ভুমিকা পালন এবং স্বাধীন বাংলাদেশে সামরিক শাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানসহ দেশ ও জাতির প্রতি অবদানের জন্য তোফায়েল আহমেদ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

গতকাল সোমবার বাদ মাগরিব ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে তোফায়েল আহমেদের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার ও কো-চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সাবেক মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী ও সাবের হোসেন চৌধুরী। এছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহ¯্রাধিক নেতাকর্মী জানাজায় অংশ নেন।

এরপর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়। তোফায়েল আহমেদের ব্যক্তিগত সহকারী আবুল খায়ের জানান, আজ মঙ্গলবার সকালে হেলিকপ্টারে করে তাকে ভোলা নেওয়া হবে। ভোলা সার্কিট হাউজ ময়দানে নামাজে জানাজা শেষে মায়ের কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হবে। এর আগে বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে তোফায়েল আহমেদের প্রতিকৃতিতে মুক্তিযোদ্ধা সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments