ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগসহ ৭ দফা দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার দ্বিতীয় দিনের মতো রাজধানীর মতিঝিলের দিলকুশায় অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরামের’ সদস্যরা।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের রাজনৈতিক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন তারা। সকাল ৯টার দিকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দেন আন্দোলনকারীরা। মানববন্ধনের মাঝেই দুপুর ১২টায় সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।
এতে গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নুরুন নবি মানিক বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবি জানিয়ে আসছি। সংবাদ সম্মেলনে দেশব্যাপী আরো বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকিও দিয়েছেন গ্রাহক ফোরামের সভাপতি। এসময় দিলকুশা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
পুলিশ, জলকামান ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করে পুরো এলাকা ঘিরে রাখা হয়। বিক্ষোভের কারণে সোমবার ব্যাংকের পূর্বনির্ধারিত বোর্ড সভা বিঘ্নিত হয়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে রাতে ভার্চুয়াল মাধ্যমে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় ইসলামী ব্যাংকের সামনে সংবাদ সম্মেলন থেকে ৭ দফা দাবি তুলে ধরা। ৭ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে, ইসলামী ব্যাংকে অবৈধভাবে নিয়োগকৃত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমকে পদত্যাগ করতে হবে। ওমর ফারুক খানকে এমডি পদে পুনর্বহাল করতে হবে। লুটপাটের সঙ্গে জড়িত কেউই ইসলামী ব্যাংকের বোর্ডে থাকতে পারবে না।
ব্যাংক রেজল্যুশন অ্যাক্ট থেকে ১৮(ক) ধারা বাতিল করতে হবে। এস আলমের দখলকৃত মালিকানা ও দেশে থাকা তার সম্পত্তি বিক্রি করে লুট করা অর্থের সমন্বয় করতে হবে। শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, এস আলম যাতে কোনো ব্যাংকেই ফিরতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী ব্যাংকসহ সকল ব্যাংক লুটকারীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস গত ২৪ মে পদত্যাগ করেন অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান। ওই দিনই বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পান। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনিসহ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তা পদত্যাগে বাধ্য হন।
আন্দোলনকারীরা ৭ দফা দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খানের সোমবার দেওয়া বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান। আন্দোলনকারীরা বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীল পদে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা গ্রাহক। গ্রাহক পরিচয়েই এখানে দাবি নিয়ে এসেছি।
আরিফ হোসেন খান সোমবার বলেন, ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তই রাস্তার কোনো আন্দোলনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না। আন্দোলনের কারণে সিদ্ধান্ত বদলও হবে না। কোনো ব্যাংকই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে ইসলামী ব্যাংকের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলম ঋণখেলাপি কি না, এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, খুরশীদ আলম নিজে ঋণখেলাপি নন, তার স্ত্রীর মালিকানাধীন একটি প্রতিষ্ঠান ঋণখেলাপি।
স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে তিন কোটি টাকা ঋণ নেওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ মালিক খুরশীদ আলমের স্ত্রী। ওই ঋণ পরবর্তী সময়ে খেলাপি হয়েছে। ফলে খুরশীদ আলমকে ঋণখেলাপি হিসেবে অভিহিত করা সঠিক নয়।
তার স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও খুরশীদ আলম ব্যক্তিগতভাবে ঋণখেলাপি নন। স্ত্রীর ঋণখেলাপির কারণে খুরশীদ আলমের চেয়ারম্যান হওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। খুরশীদ আলমকে ঘিরে সম্প্রতি পুরোনো অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এসব প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, সে সময় খুরশীদ আলমের বিরুদ্ধে ভুল তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছিল। ফলে তাকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, তা যথাযথ ছিল না। এ কারণেই পরে তিনি নির্বাহী পরিচালক এবং ডেপুটি গভর্নর হিসেবে পদোন্নতি পান।
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে খুরশীদ আলমের নিয়োগ প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে তাদের সিদ্ধান্ত সঠিক। কোনো ধরনের আন্দোলন বা চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করবে না।



