বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে কথিত ‘পুশইন’ তৎপরতা। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃক অন্তত ১০টি পৃথক পুশইন অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
সীমান্তের একাধিক পয়েন্টে লোকজনকে জড়ো করা, হোল্ডিং সেন্টারে আটকে রাখা এবং সুযোগ বুঝে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর প্রস্তুতির তথ্য পাওয়ার পর সীমান্তজুড়ে সতর্কতা জোরদার করেছে বিজিবি।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
বিজিবির তথ্যমতে, শুধু একটি বা দুটি সীমান্ত পয়েন্ট নয়, বরং ঝিনাইদহ, যশোর, জয়পুরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, সিলেট ও নেত্রকোনা—মোট আটটি জেলার সীমান্ত এলাকায় একই সময়ে পুশইনের চেষ্টা বা প্রস্তুতির তথ্য পাওয়া গেছে।

সীমান্ত নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক সীমান্তে একই ধরনের তৎপরতা দেখা যাওয়ায় বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ কম। বরং এটি সমন্বিতভাবে সীমান্তে চাপ সৃষ্টির একটি প্রচেষ্টা হতে পারে।
মহেশপুরে ৩০-৩৫ জনকে নিয়ে সীমান্তে বিএসএফ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটেছে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তে। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, সামন্তা সীমান্তে বিএসএফ একটি প্রিজন ভ্যানে করে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তিকে নিয়ে আসে। সীমান্ত গেট খুলে তাদের বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হলে বিজিবি সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে অবস্থান নেন। স্থানীয় জনগণও বিজিবির সঙ্গে প্রতিরোধে অংশ নেয়। পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলে বিএসএফ ওই ব্যক্তিদের পুনরায় ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়।
একই জেলার যাদবপুর সীমান্তে ৪ থেকে ৫ জন ব্যক্তি বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করলে বিজিবি তাদের বাধা দেয়।
যশোর সীমান্তে নারী-পুরুষকে জড়ো করার অভিযোগ
যশোরের গোগা ও রুদ্রপুর সীমান্তে কয়েকজন নারী-পুরুষকে পুশইনের উদ্দেশ্যে সীমান্তের কাছে অবস্থান করতে দেখা যায়। বিজিবির টহল ও সতর্ক অবস্থানের কারণে তাদের সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় বিএসএফ।

এর আগে যশোরের সাদীপুর সীমান্তেও ১০ থেকে ১২ জন ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বিজিবি। ওই ঘটনায় সীমান্তে অতিরিক্ত সতর্কতা জারি করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে হোল্ডিং সেন্টারে আটকদের তথ্য
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিজিবি জানিয়েছে, ভারতের ১৪৯ ও ৭১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের নিকটবর্তী তিনটি হোল্ডিং সেন্টারে চারজন মুসলিম নাগরিককে রাখা হয়েছে, যাদের নাগরিক তালিকা (SIR) থেকে বাদ পড়েছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে সোনামসজিদ সীমান্তের বিপরীতে ভারতের মালদা জেলার চন্দনপার্ক এলাকায় একটি হোল্ডিং সেন্টারে আটক ২২ জনকে বিএসএফের কাছে হস্তান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ব্যক্তিকে বাংলাদেশে পুশইনের আশঙ্কা থেকে বিজিবি সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
পঞ্চগড়ে একজনকে পুশইন, ফেরত পাঠালো বিজিবি
পঞ্চগড়ের রওশনপুর সীমান্তে একজন ব্যক্তিকে বিএসএফ পুশইন করতে সক্ষম হলেও স্থানীয় জনগণ তাকে আটক করে বিজিবির কাছে সোপর্দ করে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে তাকে ভারতের অভ্যন্তরে ফেরত পাঠানো হয়।
ঠাকুরগাঁও ও নেত্রকোনায় বাড়তি উদ্বেগ
ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুর সীমান্তে দুই বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে রেখেছে বিএসএফ। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিজিবিকে কিছু জানানো হয়নি।
নেত্রকোনার কচুগড়া সীমান্তের বিপরীতে ভারতের আসাম রাজ্যে ১৫ থেকে ২০ জন ব্যক্তিকে জড়ো করে রাখা হয়েছে বলে তথ্য পেয়েছে বিজিবি। সীমান্তের কিছু অংশে কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় ওই এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি
বিজিবি জানিয়েছে, সম্ভাব্য পুশইন প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল, পর্যবেক্ষণ ও অপারেশনাল কার্যক্রম। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সীমান্তবাসীদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
‘একতরফা পুশইন আন্তর্জাতিক রীতিনীতির পরিপন্থী’
বিজিবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যমান আইন ও বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার বাইরে গিয়ে কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর কোনো সুযোগ নেই। কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি হলে তা নির্ধারিত কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন করতে হবে।

বিজিবি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সীমান্তে যেকোনো পুশইন প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রতিহত করা হবে এবং এ বিষয়ে বাহিনী সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে।
সীমান্ত পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সীমান্তে ধারাবাহিকভাবে পুশইনের চেষ্টা দেখা যাওয়ায় বিষয়টি এখন কেবল সীমান্ত নিরাপত্তার নয়, বরং কূটনৈতিক গুরুত্বের ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। ফলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমান্তে কড়া অবস্থানের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ ও সমন্বয়ও জরুরি হয়ে উঠেছে



