চট্টগ্রামে ক্রিকেটার নাঈমকে পুলিশের মারধোর, হেনস্তা

চট্টগ্রাম বিমানবন্দর থেকে বাসায় ফেরার পথে জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে মারধর ও হেনস্থা করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নগরীর লালখান বাজার এলাকায় এই ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবালের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা হিসেবে খুলশী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও কনস্টেবল রাসেল চৌধুরীকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ সোর্স সোহেলকে পুলিশ আটক করেছে। এই ঘটনার তদন্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই ঘটনায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তার উদ্দেশ্যমূলকভাবে ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

নাঈম হাসান জানান, ঢাকা থেকে আমার ফ্লাইট ডিলে হওয়ার কারণে রাত সোয়া ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে পৌঁছাই। সেখান থেকে ১১টা ২৫ মিনিটের দিকে আমি বাসায় ফিরছিলাম। আমাকে বহনকারী সিএসজিচালিত অটোরিকশাটি লালখান বাজার ফ্লাইওভারের নিচে নামলে হঠাৎ কয়েকজন ব্যক্তি গাড়ি থামায়। কোনো ধরনের পরিচয় না দিয়ে তল্লাশির কথা বলে আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বলেন।

অটোরিকশা চালকের কাছ থেকে গাড়ির ডকুমেন্ট ছিনিয়ে নেয়। আমি তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা আমার গলা চেপে ধরে জোর করে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশের একজন সোর্স আমার গলা চেপে ধরে প¬াস্টিকের পাইপ দিয়ে আমাকে মারধর করেন। পরে তারা অটোরিকশাসহ খুলশী থানায় নিয়ে যায়। সেখানে ওসির কক্ষেও হেনস্থা করা হয় বলে অভিযোগ করেন নাঈম।

নাঈম বলেন, ফোনটি হাতে পাওয়ার পর আমি তামিম ভাইকে বিষয় জানায়। তিনি ইসরাফিল খসরু ভাইকে বলেন। ইসরাফিল খসরু ভাই ওসিকে ফোন করার পর তাদের আচরণ বদলে যায়।

শনিবার বিকেলে নাঈম হাসানের বাড়িতে যান চট্টগ্রাম মেট্টোপলিটন পুলিশের কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। সেখানে তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা পেশাদারিত্বের পরিচয় দিতে পারেননি। কোনো ব্যক্তির দায় পুলিশ বাহিনী নিতে পারে না। অভিযুক্তদের খুলশী থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ঘটনার বিষয়ে

সিএমপির উপকমিশনার (উত্তর) মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা পুলিশ বাহিনীর জন্য অবমাননাকর একটি ঘটনা। জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
গতকাল সকালে নাঈমের ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এতে এসআই শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল ও সোর্স সোহেলকে আসামি করা হয়। মামলায় মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

কেন নাঈমকে টার্গেট করল পুলিশ? : পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানরত খুলশী থানার উপপরিদর্শক মনিরুল ইসলাম একটি অটোরিকশায় সোনার চোরাচালান আসার তথ্য এসআই শফিকুল ইসলামকে দেন। ওই তথ্যের ভিত্তিতে শফিকুল ইসলাম লালখান বাজার এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন। মনিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, তিনি একটি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে চোরাচালান-সংক্রান্ত তথ্য পেয়েছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একটি গোয়েন্দা সংস্থার একজন মাঠ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা নাঈম হাসানকে শায়েস্তা করতে পুলিশকে মিথ্যা তথ্য নিয়ে অভিযানে পাঠায়। ইতিমধ্যে মনিরুলকে চট্টগ্রামে তলব করা হয়েছে। পাশাপাশি ওই গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা থেকেও ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একজন কর্মকর্তা।

নাঈম ও তার বাবা যেসব অভিযোগ আনলেন? : গতকাল শনিবার বিকেলে ঘটনার বর্ণনা দিতে ক্রিকেটার নাঈম হাসান সাংবাদিদের সামনে আসেন। তিনি বলেন, আমি জানতে চেয়েছিলাম কেন আমাকে এভাবে নেওয়া হচ্ছে। তারা কোনো সদুত্তর দেয়নি। বরং আমাকে শারীরিকভাবে হেনস্থা করা হয়। সেখানে দুইজন পুলিশ সদস্য ছিলেন। তাদের সঙ্গে সাদা পাঞ্জাবি পরা আরেকজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি নিজেও আমাকে মারধর করেন।

আমি শুধু আমার বাবাকে ফোন করার চেষ্টা করছিলাম। তখনও আমার গলা চেপে ধরা ছিল। আমি চিৎকার করলে আশপাশের মানুষজন জড়ো হতে শুরু করেন। প্রায় একশ’ থেকে দেড়শ মানুষ সেখানে উপস্থিত হন। অনেকেই আমার পরিচয় জানার পর বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করেন।

আমি নিজের পরিচয় দিয়েছি, আইডি কার্ড দেখিয়েছি। তারপরও তারা আমাকে ‘আসামি’ বলে সম্বোধন করে। আমাকে পরে পুলিশ সিএনজিচালিত অটোরিকশায় খুলশী থানায় নেয়। সেখানে আমাকে বলা হয়, চোখ নামিয়ে কথা বলতে। এমনকি যখন ওসি তামিম ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেন তখনও আমি তাকে বলেছি, আমি কথা বলতে চাই। তখনও তিনি আমাকে চুপ থাকতে বলেন। পরে তাদের আচরণ বদলে যায়।

জাতীয় দলের এই ক্রিকেটার বলেন, মানুষ আমাকে চিনত বলে আমি আজ বেঁচে গেছি। আমার জায়গায় যদি কোনো সাধারণ মানুষ থাকতেন, তাহলে তার কী হতো? তাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হতো, সেটি কেউ জানত না। একজন সাধারণ নাগরিক যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেই নিরাপদ না থাকেন, তাহলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয়।

নাঈমের বাবা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর মাহবুব আলম বলেন, আমার ছেলেকে পুলিশ তুলে নিয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে আমি দ্রুত থানায় যায়। ডিউটি অফিসার আমারে প্রথমে থানাতেই ঢুকতে দেয়নি। দূরে গিয়ে বসতে বলেন। পরে স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে থানায় প্রবেশ করার সুযোগ পাই।

জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় পাওয়ার পরও আমার ছেলেকে ন্যাক্কারজনকভাবে মারধর করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। থানায় এসে পরিচয় দেওয়ার পরও আমার ছেলেকে অপমান করে কথা বলেছেন ওসি। পরে ঢাকা থেকে বিসিবির সভাপতি তামিম ইকবাল ও পরিচালক ইসরাফিল খসরুর ফোন পেয়ে পুলিশ নমনীয় হয়।

ক্রিকেট অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও নিন্দা : নাঈম হাসানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্রীড়াঙ্গনের ব্যক্তিত্ব ও সাধারণ মানুষ। তামিম ইকবাল ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, নাঈম হাসানের সঙ্গে গত রাতে (শুক্রবার) যা হয়েছে, কোনোভাবেই তা গ্রহণযোগ্য নয়। রাতে নাঈম আমাকে ফোন করার পর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে যা যা করা দরকার, করার চেষ্টা করেছি আমি ও অন্য বোর্ড পরিচালকরা। সংশি¬ষ্ট সব জায়গায় আমরা কথা বলছি, নাঈম ও তার পরিবারের সঙ্গেও নিবিড় যোগাযোগ রাখছি।

বিসিবির পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে আজকে সকালেই। এরপর আরো যা যা করণীয় আছে, সবকিছু করব আমরা। নাঈম ও সব ক্রিকেটারের পাশে আমরা আছি সবসময়।

জাতীয় ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম লিখেছেন, নাঈমের সঙ্গে যা ঘটেছে, তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। যা ঘটেছে, তা আমাকে ব্যথিত ও লজ্জিত করেছে। একজন নাগরিক হিসেবে, একজন বাংলাদেশি হিসেবে আমি এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। নাঈম, আমরা তোমার পাশে আছি।

জাতীয় দলের ক্রিকেটার মেহেদি হাসান মিরাজ লিখেছেন, নাঈম হাসানের সঙ্গে চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া মারধর ও হেনস্থার অভিযোগ অত্যন্ত নিন্দনীয়, দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক। একজন জাতীয় খেলোয়াড়ের সঙ্গে এমন আচরণ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের মর্যাদার ওপর আঘাত। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই।

তদন্ত কমিটি ও সোর্স আটক : নাঈম হাসানকে হেনস্থা ও মারধরের ঘটনায় মোহাম্মদ সোহেল নামে পুলিশের এক সোর্সকে আটক করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনাটি তদন্তের জন্য একজন উপ-কমিশনারকে (ডিসি) প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গতকাল সাংবাদিকদের কাছে এ তথ্য নিশ্চিত করেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. মোহাম্মদ শওকত আলী। তিনি জানান, তদন্ত কমিটিকে আগামী ৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং আটক সোহেলের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সিএমপি কমিশনার আরও বলেন, দুই পুলিশ সদস্যকে একই ঘটনায় সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হচ্ছে। জানা গেছে, পুলিশের হাতে থাকা পাইপের পাশাপাশি সোহেলও নাঈমকে মারধর করেন এবং নিজেকে ডিবি সদস্য বলে পরিচয় দেন। তখন সেখানে জড়ো হওয়া জসসাধারণ তার কাছে পরিচয়পত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন। এই অবস্থায় লোকজন তাকে ধরে খুলশী থানায় নিয়ে যান। পুলিশের এই সোর্স নগরীর গরিবুল¬াহ শাহ মাজার এলাকায় বসবাস করেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments