সামনে এগোতে গেলে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর বাধা, আর পেছনে ফিরতে গেলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর বাধা। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এমন সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার গয়টাপাড়া সীমান্তের শূন্যরেখায় (জিরোলাইন) দুই শিশু, এক নারীসহ ছয় বাংলাদেশি নাগরিক মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

গত রোববার থেকে খোলা আকাশের নিচে সীমান্তের শূন্যরেখায় আটকে থাকা এসব মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে দুই শিশু। চিকিৎসার প্রয়োজন হলেও তাদের বাবা-মা কোনো ধরনের চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারছেন না। সন্তানদের বুকে জড়িয়ে অসহায়ভাবে কাঁদছেন তারা।
শূন্যরেখায় আটকে থাকা ছয়জন হলেন বেলাল হোসেন (৩৬), তার স্ত্রী সুমি আক্তার (৩০), তাদের দুই সন্তান ফাতেমা আক্তার (৪) ও ছয় মাস বয়সী ফাইমা আক্তার, সজিব মিয়া (২৩) এবং অপর এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি।
গয়টাপাড়া সীমান্তের বাসিন্দা গোলজার হোসেন জানান, বেলাল হোসেন ও সুমি আক্তার নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তারা ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের কংশেরকুল গ্রামের বাসিন্দা। কয়েক মাস আগে তারা সিলেট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন।
তিনি বলেন, “মানবিক কারণে আমরা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থানরত নারী ও শিশুদের পানি ও খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছি। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে সেখানে বেশিক্ষণ অবস্থান করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই পাশেই দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। শিশুসহ এসব মানুষ চরম মানবিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মানবতার স্বার্থে দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা বদর উদ্দিন বলেন, “শূন্যরেখায় আটকে থাকা ব্যক্তিরা চিৎকার করে নিজেদের বাংলাদেশি নাগরিক বলে পরিচয় দিচ্ছেন এবং দেশে ফিরতে চান বলে জানাচ্ছেন। তাদের স্বজনরাও সীমান্তে এসে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। বিশেষ করে শিশু দুটির অবস্থা দেখে খুব কষ্ট লাগে। প্রচণ্ড রোদে তারা বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।”
এদিকে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার বিরুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা রিটন মিয়া জানান, আটকে থাকা ছয়জনের মধ্যে তার ছেলে সজিব মিয়াও রয়েছে। খবর পেয়ে তিনি রোববার বিকেলে গয়টাপাড়া সীমান্তে এসে বিজিবির সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্র জমা দেন।
রিটন মিয়া বলেন, “আইনি জটিলতার কথা বলে বিজিবি আমার ছেলেকে দেশে ঢুকতে দিচ্ছে না। এমনকি আমাকে তার কাছে যেতেও দেওয়া হচ্ছে না। আমি ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে চাই। বেলাল ও সুমিও আমাদের প্রতিবেশী। আমরা সবাই কয়েক মাস আগে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলাম।”

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ জুন ভোরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ নারী ও শিশুসহ ছয়জনকে গয়টাপাড়া সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করে। কাঁটাতারের এপারে বাংলাদেশ অংশে ঠেলে দেওয়া হলেও বিজিবি ও স্থানীয় গ্রামবাসীর বাধার মুখে তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি।
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের গয়টাপাড়া ক্যাম্পের কমান্ডার সুবেদার শফিকুল ইসলাম বলেন, “বিএসএফ সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে নারী ও শিশুসহ ছয়জনকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে তারা শূন্যরেখার কাছাকাছি ভারতীয় অংশে অবস্থান করছে। পুশইনের ঘটনার পর রোববার কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তিনি আরও জানান, বৈঠকে বিএসএফ আটকে থাকা ব্যক্তিদের বাংলাদেশের নাগরিক বলে দাবি করেছে। পরবর্তীতে আবারও পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানানো হলেও বিএসএফের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যায়নি। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষ্পত্তির জন্য নতুন করে বৈঠকের চেষ্টা চলছে।
জামালপুর ৩৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল হাসানুর রহমান বলেন, “উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমান্তে জনবল ও নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। স্থানীয়রাও বিজিবিকে সহযোগিতা করছেন। নারী-শিশুসহ আটকে থাকা ব্যক্তিরা এখনও আগের স্থানেই অবস্থান করছেন। বিএসএফ তাদের ঠেলে পাঠিয়েছে, আর বিজিবি তাদের প্রবেশ করতে দেয়নি। পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাউকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।



