সিলেটের পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে আজ সোমবার  সিলেট নগরীর একটি হোটেলের সম্মেলনকক্ষে ‘সিলেটের পরিবেশ ও প্রকৃতি: সংকট ও সুপারিশ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে পরিবেশবিদ, গবেষক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও তরুণ জলবায়ু কর্মীরা অংশগ্রহণ করেন।

বাপা সিলেট জেলা শাখার সভাপতি জামিল আহমদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গোলটেবিল বৈঠকের শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন বাপা সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাপার কার্যকরী কমিটির সদস্য কবি আয়েশা মুন্নী। 

ধারণাপত্রে কাসমির রেজা সিলেট অঞ্চলের পাঁচটি প্রধান পরিবেশগত সংকট—পাহাড় ও টিলা কর্তন, জলাবদ্ধতা, জলাভূমি ভরাট, অবৈধ বালু ও পাথর উত্তোলন এবং ইকো-ট্যুরিজম ও প্লাস্টিক দূষণের বিষয় তুলে ধরা হয়। এতে উল্লেখ করা হয় যে, গত দুই দশকে সিলেটে নগরায়ণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও জলাভূমি ও জলাশয়ের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বক্তারা বলেন, এসব সংকট একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত এবং এর ফলে বন্যা, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও খনিজ সম্পদ অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান, অধ্যাপক ড. মুস্তাক আহমদ, বন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মোহাম্মদ রেদোয়ান, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি নির্মাণ ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের চেয়ারম্যান ড. তারিকুল ইসলাম ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল ইসলাম,  সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ মোহাম্মদ আতীকুল হক।

তারা বিজ্ঞানভিত্তিক পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নদীর নাব্যতা রক্ষা এবং পরিবেশ ধ্বংস ও জলবায়ু পরিবর্তনের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেন। বক্তারা বলেন, পাহাড় কাটা, জলাভূমি ভরাট ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের মতো কার্যক্রম সিলেটের পরিবেশগত বিপর্যয়কে আরও ত্বরান্বিত করছে।

সম্মানিত আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট শিরীন চৌধুরী, সিলেট প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাপা সিলেটের সহ-সভাপতি ইকবাল সিদ্দিকী, বাপা সিলেটের সহ-সভাপতি অধ্যক্ষ ভাস্কর রঞ্জন দাস, সিলেট বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান।  তারা পরিবেশ আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা, পরিবেশবিষয়ক অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং নাগরিকদের পরিবেশগত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তরুণ জলবায়ু কর্মীদের পক্ষে বক্তব্য রাখেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশ ক্লাবের আহ্বায়ক নিহাল তাসিন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রিন এক্সপ্লোরার সোসাইটির প্রতিনিধি হাসিব এবং মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী প্রীতি। তাঁরা জাফলং, বিছনাকান্দি ও টাঙ্গুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় প্লাস্টিক দূষণ রোধ এবং দায়িত্বশীল ইকো-ট্যুরিজম নীতি প্রণয়নের দাবি জানান।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মোঃ আবুল কালাম আজাদ বলেন, সিলেটের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি জাফলং, গোয়াইনঘাট ও বিছনাকান্দিকে পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণার প্রক্রিয়া চলমান। তিনি পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা পাহাড় ও টিলা কর্তনের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, জলাভূমি সংরক্ষণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, সমন্বিত নগর ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন, অবৈধ পাথর কোয়ারি ও ড্রেজার কার্যক্রম বন্ধ, পর্যটন এলাকায় একক ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধকরণ, পরিবেশ অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ পরিবেশ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সিলেটের জন্য একটি সমন্বিত পরিবেশ সংরক্ষণ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের সুপারিশ করেন।

সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে জামিল আহমদ চৌধুরী বলেন, পাহাড়, নদী, হাওর ও জলাভূমি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এগুলো এ অঞ্চলের মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবেশ ধ্বংস করে কোনো উন্নয়নই টেকসই হতে পারে না।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments