কর্মী সংকটে সিলেট বিভাগে ডিজিটাল ভূমি জরিপের কাজ ব্যাহত

অনেক চড়াই উতরাইয়ের পর সিলেট বিভাগে ম্যানুয়েলি ভূমি জরিপের পর এখন অবিশিষ্ট ভূমিতে ‘ডিজিটাল জরিপ’ শুরু হয়েছে। শুরু থেকেই বিপুল সংখ্যক কর্মী স্বল্পতা সহ না প্রতিকুলতার মধ্যে জরিপ কাজ চলে। তা এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে সহকারী সেটেলম্যান্ট অফিসারের সংখ্যা খুব কম ।

ভূমি জরিপ অধিদপ্তরের সিলেট অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার সোনিয়া সুলতানা বলেন, কর্মী স্বল্পতার কারণে কাজে ব্যঘাত ঘটছে। তবে তারা কাজ শেষ করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ডিজিটাল জরিপ ব্যক্তিগত জমির মালিক এবং অন্যদের জন্য অগ্রিম নথিপত্র তৈরির উদ্দেশ্যে জমির আরও ভালো ও নির্ভুল মাঠ জরিপে সহায়তা করবে। কর্মকর্তারা জানালেন সিলেটের দুর্গম এলাকাটির জরিপের জন্য ‘ড্রোন’ এবং ‘ইলেকট্রনিক টোটাল স্টেশন’ (ইটিএস) ব্যবহার করা হচ্ছে।

এছাড়া ডিজিটাল জরিপের জন্য ভূমি রেকর্ড ও জরিপ বিভাগ ইতোমধ্যে ‘স্যাটেলাইট প্রযুক্তি’ ব্যবহার করে‘ জিওডেটিক’কন্ট্রোল পয়েন্ট (স্থায়ী নির্দেশক চিহ্ন) স্থাপন করেছে বলে জানান সহকারী বন্দোবস্ত কর্মকর্তা আবু বকর সিদ্দিক। মৌলভীবাজার জেলার পাথরিয়ার বিশাল বনাঞ্চলে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে বেশ কয়েকটি জরিপ দল পাথরিয়া বনের বিশাল দুর্গম এলাকায় জরিপ সম্পন্ন করেছে। এখন মানচিত্র প্রস্তুত করা হচ্ছে।

মাস দুয়েকের মধ্যে মানচিত্র হস্তান্তর করা হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান,বছরের পর বছর ধরে কোনো জরিপ না হওয়ায় জমির মালিকানা নিয়ে অসংখ্য বিরোধ রয়েছে সেখানে। এই জরিপ বিরোধ নি®পত্তির পথ প্রশস্ত করবে। বন বিভাগের বহু বেদখলী ভূমি উদ্ধার করা সুযোগ সৃষ্টি হলো।

এদিকে সূত্র মতে ১৯৮৭-৮৮ সালে সিলেট বিভাগে ম্যানুয়েল জরিপ কাজ শুরু হয় ৫ হাজার ৪৫৭ টি মৌজাকে লক্ষ্য রেখে। দীর্ঘ ৩৯ বছরে এসব মৌজার জরিপ কাজ ম্যানুয়েলী শেষ হলেও ৬৪ টি মৌজার নক্সা প্রণয়ের কাজ চরছে। উচ্চ আদালতে রিট মামলার কারণে ৩৪ টি মৌজার গেজেট নোটিফিকেশন বিলম্বিত হচ্ছে। সংস্লিষ্টরা বলেন, জরিপ কাজটি মূলত: কঠিন। সতর্কতার সাথে করতে হয়। লোকবল সমস্যা, প্রকৃতিক দুর্যোগ, আইনী জটিলতা সহ নানা করণে এ কাজে সময় লাগে।

কর্মকর্তরা বলেন, ‘তারপরও আমরা অনেক জেলা থেকে জরিপ কাজে এগিয়ে আছি।’ তারা বলেন, সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবেনা কত দিন সময় লাগে একটি এলাকার জরিপ শেষ করতে। সেটা নির্ভর করে কাজটি শুরুর উপর। যদিও সরকার থেকে ৫ বছর মেয়াদ দেয়া আছে। ‘ডিজিটাল জরিপ’ শুরু হওয়ায় সংস্লিষ্ট এলাকাবাসী অনেকটাই স্বস্থিতে।

পাথরিয়ার দুর্ঘম বনাঞ্চলে ডিজিটলি জরিপ শেষ, ছাতকে চলমান:
সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার জুরি পাথারিয়া ফরেষ্টে ডিজিটাল জরিপ শেষ। এখন নক্সা প্রস্তুতের কাজ চলছে। দ‘ুমাসের মধ্যে নক্সা হস্তান্তর করা হবে জেলা প্রশাসন বরাবরে। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলায় এখন ডিজিটাল ভূমি জরিপের কাজ চলছে।

ছাতকের সহকারী বন্দোবস্ত কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা লিটন বলেন,ছাতকের ১৪১টি মৌজায় ডিজিটাল পদ্ধতিতে জরিপ হবে। ২১টি মৌজার কাজ চলছে। ইতিমধ্যে ৪টি মৌজার খসড়া মানচিত্র তৈরি করা হয়েছে। আরও ৭টিতে মাঠ পর্যায়ের জরিপ চলছে। তবে, লোকবল সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাঠ পর্যায়ে আবাসিক সমস্যা সহ নানা সমস্যা কাজে বিঘ্ন হচ্ছে।

ইসহাকপুর মৌজার বাদে চক এলাকার সহকারী সেটেলম্যান্ট ও হল্কা অফিসার মো. আলী আজজম জানান, অতিরিক্ত বৃষ্টি,নিচু এলাকায় জমে থাকা পানির জন্য কয়েক সপ্তাহ কাজে বিঘ্ন ঘটে। ছাতকের আলিগঞ্জ বাজার সহ কয়েকটি এলাকা পরিদর্শনকালে শ্রকরপুর মৌজার সহকারী সেটেলম্যান্ট ও হল্কা অফিসার মো. আওলাদ হোসেন বলেন, চলমান ‘ডিজিটাল জরিপ’র উপর লোকজনের আস্থা রয়েছে। স্থানীয় বসিন্দারা এই ব্যবস্থায় খুশি। তবে বন্যা ও প্রবল বৃষ্টিতে সময়মত কাজ শেষ হবে কিনা তারা সংশয় প্রকাশ করছেন ।

১০৫ বছর পর এবার ভূমি জরিপ :
মৌলভীবাজার জেলার জুরি উপজেলার পাথারিয়া পার্বত্য সংরক্ষিত বনাঞ্চল একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকা। বেশ কিছু অংশ ভারতের লাগুয়া। গভীর জঙ্গলে অবস্থিত হওয়ায় ১৯৫৬ সালের এই এলাকার জরিপ সম্ভব হয়নি। বার জরিপ কর্মীরা এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্গম এলাকাটির জরিপের জন্য ড্রোন এবং ইলেকট্রনিক টোটাল স্টেশন (ইটিএস) ব্যবহার করেছেন। এই জরিপ বন বিভাগের মালিকানাধীন বিশাল বনভূমি রক্ষায় সহায়তা করবে।

পাথারিয়া পাহাড় সংরক্ষিত বনাঞ্চল হিসাবে ঘোষনা করা হয় ১৯২০ সালে। এর আগে এটি কোন সময় জরিপ হয়নি। ১০৫ বছর পর এবার ভূমি রেকর্ড ও জরিপ বিভাগ ২০২৫ সালের শেষ দিকে সংরক্ষিত এই বনাঞ্চলের ‘ডিজিটাল জরিপ‘র কাজ শুরু হয়। এখন নক্সা তৈরীর অপেক্ষায়।

বন কর্মকর্তা বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি জুরির লাঠিটিলা থেকে বড়লেখা উপজেলার বোবারতাল পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার বিস্তৃত। ২৩ হাজার ৫২০ একর আয়াতনের এই এলাকায় বেশ কয়েকটি চা বাগানও রয়েছে। এটি বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বসতিরও আবাসস্থল। এখানে আগে জরিপ না হওয়ায় ভূমি নিয়ে শত বিরোধ, খুনখারাবি সহ অসংখ্য ঘটনা রয়েছে।

সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান বলেন, জরিপের পর মানচিত্র পেলে ভূমি বিরোধের নি®পত্তি ও বন ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়নেও সহায়ক হবে। পাথারিয়া পাহাড় সংরক্ষিত বনাঞ্চলটি ভারতের আসাম পর্যন্ত বিস্তৃত। স¤পূর্ণ এলাকা পাহাড়, ঝর্ণা চা বাগান বেষ্টিত ও পর্যটন বেষ্টিত। এলাকাটির ‘ডিজিটাল জরিপ’এ অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় সহায়তা করবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments