সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুবাইয়ে প্রায় দেড় মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। দুবাইয়ের একটি আদালত তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করার পর প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে গত ৩০ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তবে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আপাতত তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়তে পারবেন না। তার পাসপোর্ট আদালতের জিম্মায় রয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আবেদনের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে দুবাইয়েই অবস্থান করতে হবে।
রোববার (২ আগস্ট) বেনজীর আহমেদের ঘনিষ্ঠ ও পারিবারিক সূত্রের বরাত দিয়ে দেশের একাধিক গণমাধ্যম এ তথ্য প্রকাশ করেছে।
যেভাবে গ্রেপ্তার হন
গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেনজীর আহমেদকে আটক করে। পরে বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। কয়েক দিন পর জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও তার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে শনাক্ত ও আটকের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম চলছে।
৪৮ দিনের আইনি লড়াই
দুবাইয়ে আটকের পর বেনজীর আহমেদকে স্থানীয় কারাগারে রাখা হয়। সেখানে তিনি জামিনের আবেদন করেন। দীর্ঘ শুনানি, নথি যাচাই-বাছাই এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনার পর গত ২৭ জুলাই দুবাইয়ের আদালত তাকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেন।
পরবর্তী তিন দিন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ জুলাই তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৮ দিন তাকে দুবাইয়ের কারাগারে থাকতে হয়েছে।
যেসব শর্তে মুক্তি
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, জামিন পেলেও বেনজীর আহমেদের ওপর বেশ কয়েকটি কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়েছে। তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ করতে পারবেন না। তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকবে এবং চলমান প্রত্যর্পণ ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে।
এ কারণে জামিনে মুক্তি পেলেও আপাতত তার অন্য কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এখনো চলমান
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আবেদনের শুনানি ও অন্যান্য বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। ফলে তার জামিনে মুক্তি পাওয়া মানেই মামলার নিষ্পত্তি নয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুবাইয়ের আদালত প্রত্যর্পণ আবেদনের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।
একাধিক মামলার আসামি
সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন কমিশনের একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্বে থাকাকালে তিনি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জন করেছেন এবং অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগে আদালতের নির্দেশে তার দেশ-বিদেশের বিপুল সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলে ইন্টারপোলের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ।
আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নেই
বেনজীর আহমেদের জামিনে মুক্তির বিষয়ে এখন পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি। একইভাবে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি), পুলিশ সদর দপ্তর কিংবা দুর্নীতি দমন কমিশনও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে দুদকের তদন্ত শুরু হয়। পরে তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি প্রক্রিয়া শুরু হয়।



