রংপুরের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ছয় পরিবারের মাঝে এখনও কাটেনি শঙ্কা ও কষ্ট। স্বজন হারানোর দুই বছর পেরিয়ে গেলেও চোখের পানি শুকায়নি তাদের। প্রিয়জন হত্যার বিচার পাওয়ার আশায় সরকারের দিকে তাকিয়ে আছেন পরিবারগুলো।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে সারাদেশের মতো রংপুরও ছিল উত্তাল। নানা বাধা উপেক্ষা করে রাজপথে নামে ছাত্র-জনতা। তিন দফায় রংপুরে শহীদ হন ছয়জন। এদের মধ্যে গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ হিসেবে ইতিহাসে নাম লেখান বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ।
আবু সাঈদের পর ১৮ জুলাই রংপুরে শহীদ হন অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া। পরদিন ১৯ জুলাই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান আরও চারজন। তারা হলেন—সাজ্জাদ হোসেন, মোসলেম উদ্দিন, মেরাজুল ইসলাম ও আব্দুল্লাহ আল তাহির।
তবে দুই বছর পরও এসব শহীদ পরিবারের মধ্যে ফিরে আসেনি স্বস্তি। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তারা এখন অপেক্ষা করছেন বিচারের।
যেভাবে শহীদ হন আবু সাঈদ
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই দুপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য শিক্ষার্থীরা সরে গেলেও আবু সাঈদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় পুলিশ কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আবু সাঈদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রংপুর। ১৮ জুলাই নগরীর মডার্ন মোড়ে সংঘর্ষে অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া নিহত হন।
এরপর ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর গায়েবানা জানাজাকে কেন্দ্র করে নগরীতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়। টাউন হল, পায়রা চত্বর, নিউ মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকা পরিণত হয় সংঘর্ষস্থলে।
সেদিন পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন পূর্ব শালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, গণেশপুরের স্বর্ণ শ্রমিক মোসলেম উদ্দিন, নিউ জুম্মাপাড়ার ফল ব্যবসায়ী মেরাজুল ইসলাম এবং ঢাকার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল তাহির।
বিচারের অপেক্ষায় শহীদ পরিবার
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের আদালত দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ২৮ আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে অন্য শহীদদের হত্যার ঘটনায় বিচারিক কার্যক্রম এখনও এগোয়নি বলে অভিযোগ স্বজনদের।
দ্রুত তদন্ত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন বলেন, “ছেলে হত্যার দুই বছর হয়ে গেল। ছেলের শোক কোনোদিন বুক থেকে যাবে না। প্রতিটি মুহূর্তে তাকে মনে পড়ে। আদালত যে রায় দিয়েছেন, তার কার্যকর আদেশ যদি জীবিত থাকতে দেখে যেতে পারতাম।”
তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের দ্রুত শাস্তি কার্যকর করার দাবি জানান।
শহীদ সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী জিতু বেগম বলেন, “দুই বছর ধরে স্বামী হারানোর শোক বয়ে বেড়াচ্ছি। এখনও বিচার পেলাম না। মামলার তদন্ত শেষ হয়নি, চার্জশিটও দেওয়া হয়নি। দেশের জন্য স্বামী জীবন দিয়েছেন, আমাকে বিধবা করেছেন, সন্তানদের পিতৃহীন করেছেন।”
শহীদ মেরাজুল ইসলামের স্ত্রী নাজনিন ইসলাম বলেন, স্বামীকে হারিয়ে তারা অসহায় হয়ে পড়েছেন। দ্রুত বিচার শেষ করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানান তিনি।
শহীদ আব্দুল্লাহ আল তাহিরের বাবা আব্দুর রহমান বলেন, “ছেলের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের হাল ধরবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মামলা হয়েছে, তবে এখন কোন পর্যায়ে আছে তা জানি না।”
শহীদ পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া শেষ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। তাদের মতে, বিচারই পারে হারানো স্বজনদের প্রতি রাষ্ট্রের দায় পূরণ করতে।



