সিলেটে বাসে বাসে সংঘর্ষে ৯, বগুড়ায় শ্রমিকদের ওপর বাস উঠে নিহত ৭
ছুটির দিনের সকালেই দেশের দুই মহাসড়কে ঝরল ১৬ প্রাণ। সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরে দুটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে ৯ জন নিহত ও অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বগুড়া-নওগাঁ আঞ্চলিক মহাসড়কের এরুলিয়ায় কাজের সন্ধানে দাঁড়িয়ে থাকা দিনমজুরদের ওপর বাস উঠে গেলে নিহত হয়েছেন সাতজন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২০ জন।
শুক্রবার সকালে পৃথক এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে বগুড়ায় দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে গতিরোধক নির্মাণের কাজ শুরু করার পর অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
ওসমানীনগরে বাসে বাসে সংঘর্ষে নিহত ৯
সিলেট অফিস জানায়, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ওসমানীনগরের কাশিকাপন এলাকায় সিলেটমুখী বেঙ্গল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে ঢাকামুখী ইউনিক পরিবহনের বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ইউনিক পরিবহনের বাসটি সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ও স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। পুলিশ জানিয়েছে, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি দ্রুতগতিতে চলছিল এবং নিজস্ব লেন ছেড়ে যাওয়ার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। হতাহতদের অধিকাংশই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী।
দুর্ঘটনায় নিহত চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার লক্ষ্মীপুরের হাজী সাইফুল ইসলাম (৫৫), সিলেটের দক্ষিণ সুরমার চন্ডিপুর এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের তিন বছরের মেয়ে জাইফা, সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম (২২) এবং কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চন্ডিবের বাবুল মিয়ার মেয়ে পেহেলী ভৈরবী (১৭)।
শেরপুর হাইওয়ে থানার ওসি আনিসুর রহমান জানান, নিহত অপর পাঁচজনের পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। মরদেহগুলো থানায় রাখা হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির জানান, দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত ১৬ জনকে হাসপাতালে আনা হয়। আহতদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের একজনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। অপরজনের অস্ত্রোপচার চলছে।
আহতদের একজন কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের ফারুক মিয়া (৫২)। তিনি জানান, তারা পাঁচ বন্ধু হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার জিয়ারত করতে সিলেটে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন উড়োজাহাজে ঢাকায় ফিরে যান। সাইফুলসহ অপর তিনজন ইউনিক পরিবহনের বাসে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। দুর্ঘটনার আগে বাসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন ফারুক। বিকট শব্দে ঘুম ভাঙার পর নিজেকে বাসের ভেতর চিৎ হয়ে পড়ে থাকতে দেখেন।
ফারুকের বন্ধু নিহত সাইফুল ইসলাম পেশায় ঠিকাদার ছিলেন। পারিবারিক সূত্র জানায়, এক ছেলে ও এক মেয়ের বাবা সাইফুল কুলিয়ারচর উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ছিলেন।
শ্রমিক হাটে বাস উঠে নিহত ৭
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, রংপুর, গাইবান্ধা, পাবনাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা দিনমজুররা প্রতিদিন ভোরে বগুড়ার এরুলিয়া বাজারের শ্রমিক হাটে কাজের সন্ধানে জড়ো হন। স্থানীয় গৃহস্থরা ওই হাট থেকেই দৈনিক মজুরিতে শ্রমিক সংগ্রহ করেন।
শুক্রবার ভোরেও কাজের আশায় শ্রমিকরা সেখানে জড়ো হয়েছিলেন। এ সময় ঢাকা থেকে নওগাঁগামী শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনসহ মোট সাতজনের মৃত্যু হয়। আহত হন অন্তত ২০ জন।
নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন বগুড়ার বেলাল হোসেন (৩৭), গাইবান্ধার আমিরুল ইসলাম (৪৫), নূর আলম (৩৫), ফয়জার রহমান (৪৩), আবদুর রহিম (৪৬) এবং জয়পুরহাটের তাজমুল (৪৫)।
বগুড়া সদর থানার ওসি ইব্রাহীম আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, একটি মোটরসাইকেল আরোহীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। প্রথমে একটি খুঁটিতে ধাক্কা দেওয়ার পর বাসটি শ্রমিকদের ওপর উঠে যায়।
দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। তাদের অভিযোগ, এই এলাকায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। তারা স্থায়ীভাবে গতিরোধক নির্মাণের দাবি জানান। অবরোধের কারণে মহাসড়কের দুই পাশে প্রায় ছয় কিলোমিটার এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়।
পরে স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সওজ কর্তৃপক্ষ ঘটনাস্থলে স্পিডব্রেকার নির্মাণের কাজ শুরু করলে অবরোধ তুলে নেওয়া হয়। বর্তমানে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
তদন্ত কমিটি, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা
শ্রমিকদের ওপর বাস উঠে সাতজন নিহতের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বগুড়া জেলা প্রশাসন। নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা এবং আহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। আহতদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা ও সরকারি ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।
শুক্রবার বিকেলে বগুড়া জেলা প্রশাসক তৌফিকুর রহমান এসব তথ্য জানান।
বিকেলে ফের দুর্ঘটনা, নিহত দম্পতি
এদিকে সকালের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে এরুলিয়া এলাকায় বগুড়া বিমানবন্দরের সামনে প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোটরসাইকেল আরোহী এক দম্পতি নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাদের সঙ্গে থাকা আট বছরের এক শিশুও গুরুতর আহত হয়েছে।
নিহতরা হলেন বগুড়া শহরের আটাপাড়া এলাকার মৃত মোসলেম উদ্দিনের ছেলে ব্যবসায়ী বাবুল হাসান (৫৫) ও তার স্ত্রী জেসমিন বিবি (৪৭)। আহত শিশু জুলকার নাঈন নিহত বাবুল হাসানের বড় ছেলে রেজাউল করিম রেজার সন্তান।
গুরুতর আহত শিশুটিকে উদ্ধার করে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
একই দিনে পৃথক দুটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি এবং এরুলিয়ায় একের পর এক দুর্ঘটনার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।



