রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় চার্জশিট দিল পুলিশ

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সি শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় পাঁচ দিনের মধ্যেই আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। ৪৭পৃষ্টার অভিযোগপত্রে আসামি করা হয়েছে সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে।

অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে হত্যায় সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। রবিবার বিকালে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকা মহানগরের শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন অভিযোগ গঠনের শুনানি জন্য আগামী ১ জুন দিন নির্ধারণ করেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই অহিদুজ্জামান গতকাল দুপুরে দুই আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। তিনি বলেন, ‘সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ এবং স্বপ্নার বিরুদ্ধে ধর্ষণের পর হত্যায় সহায়তার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। মামলায় ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।’

ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালত অভিযোগপত্রটি বিচারের জন্য প্রস্তুত হওয়ায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীনের আদালতে বদলির আদেশ দেন। এ দিন সোহেল রানা ও স্বপ্নাকেও কড়া পাহারায় আদালতে হাজির করা করা হয়। তবে তাদের এজলাসে তোলা হয়নি।

গত মঙ্গলবার দুপুরে পল্লবীর ১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি ভবনের ফ্ল্যাট থেকে শিশু রামিসার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ঐদিন সকালে পাশের ফ্লাটের বাসিন্দা ৩২ বছরের সোহেল শিশুটিকে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যার পর মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। এরপর ফ্ল্যাটের এই ভাড়াটে গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। তবে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার ঘরেই ছিলেন। পুলিশ বাসা থেকে স্বপ্নাকে আটক করে। পরে ঐদিন সন্ধ্যায় সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই ঘটনায় রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদি হয়ে দুই জনকে আসামি করে সেদিনই পল্লবী থানায় মামলা করেন।

শিশু রামিসাকে হত্যার আগে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত করেছে ফরেনসিক ও ডিএনএ প্রোফাইলিং প্রতিবেদন। ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, মূল অভিযুক্ত সোহেল রানাই রামিসাকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধে হত্যা করে। গত শনিবার সিআইডির ফরেনসিক ইউনিট এবং শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে এই ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করে।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, পল্লবীর সেকশন-১১ এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে পরিবারের সঙ্গে থাকত রামিসা। সে পপুলার মডেল হাই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সোহেল ও স্বপ্না ওই বাসার অন্য ফ্ল্যাটে থাকতেন।

মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে রামিসা বাসা থেকে বের হলে আসামিরা কৌশলে তাকে ভবনের তৃতীয় তলায় তাদের রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে আসামিদের রুমের সামনে মেয়েটির স্যান্ডেল দেখতে পায় তার মা।

এরপর ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে রামিসার মা ফ্ল্যাটের অন্যদের নিয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন। এ সময় সোহেল ও স্বপ্নার রুমে রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং বাথরুমের বালতির মধ্যে মাথা দেখতে পায়। স্বপ্না সেখানে দাঁড়ানো ছিলেন।

জিজ্ঞাসাবাদে স্বপ্না বলেছেন, রামিসাকে বাথরুমে আটকে রেখে ধর্ষণ করে মেরে ফেলেছে সোহেল। লাশ গুম করার জন্য মাথা ছুরি দিয়ে কেটে আলাদা করেন এবং দুই হাত কাঁধ থেকে অর্ধ বিচ্ছিন্ন করে মৃতদেহ বাথরুম থেকে এনে শোবার ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। কাটা মাথা বাথরুমের বালতির মধ্যে রেখে জানালার গ্রিল কেটে সোহেল পালিয়ে যান।

এদিকে আসামিপক্ষে ঢাকা আইনজীবী সমিতির কোনো সদস্য আইনি সেবা দিবে না মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী হিসেবে আজিজুর রহমান দুলুকে গত শনিবার বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

সোহেল রানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। সেখানে সোহেল রানা দাবি করেছে, ঘটনার আগের রাতে সে ইয়াবা সেবন করেছিল। মাদক সেবন করে বিকৃত যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়া এই আসামি আদালতকে জানায়, ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে তার পূর্ব কোনো শত্রুতা ছিল না।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সরকারি কৌঁসুলি (স্পেশাল পিপি) অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু বলেন, ‘দুই আসামিকে অভিযুক্ত করে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছে। আদালত তা গ্রহণ করেছেন। এতে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে।’

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments