গোপন বৈঠকের গল্প, এবং যারা এই গল্প বানাচ্ছেন

স্যার হাবিলদার জেনারেল

একটি প্রশ্ন দিয়ে শুরু করা যাক। ২০২২ সালে ঢাকায় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সম্মেলনে বিএসএফ প্রধান পঙ্কজ কুমার সিং যখন বাংলাদেশের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন, তখন কি কোনো বাংলাদেশি পত্রিকা সেটিকে “গোপন বৈঠক” বলেছিল? ২০২৫ সালে বিএসএফ প্রধান দলজিৎ সিং চৌধুরী ঢাকায় এসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করলেন—তখনও কি কেউ “গোপন বৈঠক” বলে চিৎকার করেছিল?
করেনি। কারণ এটি গোপন বৈঠক নয়। এটি প্রটোকল।

কিন্তু ২০২৬ সালে দিল্লিতে বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী যখন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, একটি পক্ষ হঠাৎ সক্রিয় হয়ে উঠল। “গোপন বৈঠক”। “অজানা সমঝোতা”। “সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন”। শব্দগুলো পরিচিত। কৌশলটাও পরিচিত।

যারা এই ন্যারেটিভ তৈরি করছেন, তারা দুটি সত্য ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করছেন।

প্রথম সত্য হলো, অমিত শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিএসএফ তাঁর মন্ত্রণালয়ের অধীন। সুতরাং বিজিবি মহাপরিচালক যখন দিল্লিতে যান এবং বিএসএফের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যেই পড়ে। এই সাক্ষাৎে বাংলাদেশ সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের প্রশ্নে উদ্বেগ সরাসরি দায়িত্বশীল পক্ষের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছে। এটি দুর্বলতা নয়, কৌশলগত সুযোগ।

দ্বিতীয় সত্য হলো, এই সাক্ষাৎ পূর্বনির্ধারিত এবং অনুমোদিত ছিল। যে বৈঠক অ্যাজেন্ডায় থাকে, প্রতিনিধিদল জানে, দুই পক্ষ সম্মত হয়—সেটাকে “গোপন” বলার অর্থ হয় শব্দের অর্থ না জানা, নয়তো শব্দের অর্থ ঘুরিয়ে দেওয়া।

এই ন্যারেটিভের উৎস কোথায়, সেটা লক্ষ করার মতো। আমার দেশের প্রতিবেদনের পরপরই ভারতের কিছু প্রোপাগান্ডামুখী মিডিয়া বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে। দুই দেশের সম্পূর্ণ বিপরীত স্বার্থের পক্ষ একই সুরে কথা বলছে—এই কাকতালীয়তাটুকু নিয়ে পাঠক নিজেই ভাবুন।

আসল কারণটি অন্যত্র। বিজিবি সম্প্রতি পুশ-ইন প্রতিরোধে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছে, তা ভারতের সীমান্ত-ন্যারেটিভের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। নারী, শিশু, নিরস্ত্র মানুষকে রাতের অন্ধকারে জিরো লাইনের দিকে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা সীমান্তে প্রতিহত হচ্ছে। এই প্রতিরোধ ময়দানে থামানো যাচ্ছে না বলেই ন্যারেটিভের ময়দানে আক্রমণ শুরু হয়েছে। বিজিবি নেতৃত্বকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারলে বাহিনীর মনোবলে চিড় ধরানো যায়—এই হিসাব।

কিন্তু হিসাবটি মিলবে না। কারণ নজির সামনে আছে, প্রটোকল স্পষ্ট এবং বিজিবির অবস্থান রেকর্ডে আছে। “গোপন বৈঠক” বলে যারা চিৎকার করছেন, তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন—ঢাকায় বিএসএফ প্রধানের সাক্ষাৎ যদি স্বাভাবিক হয়, দিল্লিতে বিজিবি প্রধানের সাক্ষাৎ “গোপন” হয় কোন যুক্তিতে?

এই প্রশ্নের উত্তর তাদের কাছে নেই। থাকার কথাও নয়। কারণ তারা সাংবাদিকতা করছেন না—ন্যারেটিভের রাজনীতি করছেন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments