তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ, আহত শতাধিক


জবি, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদ্রাসায় পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ; পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন

রাজধানীর তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে পৃথক এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় বলে জানা গেছে।

সংঘর্ষের ঘটনায় তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ক্যাম্পাসগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে মুখোমুখি ছাত্রদল-শিবির

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল। আধিপত্য বিস্তার ও আবাসিক হল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। এরই ধারাবাহিকতায় গত তিন দিনে দেশের অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাস সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ, আহত ৩০

গতকাল সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনার শুরু হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত একটি সেমিনারে প্রবেশকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে দুই পক্ষ।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত সেমিনারে অংশ নিতে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরে শহীদ মিনার এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

এ ঘটনায় উভয় পক্ষের প্রায় ৩০ জন আহত হন। কয়েকজনকে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।

জকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রক্টরিয়াল টিম শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেয় এবং পরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হামলা চালান।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করায় পরিস্থিতির অবনতি হয়।

ঢাকা কলেজে সংঘর্ষ, আহত প্রায় ৫০

গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

সংঘর্ষে ঢাকা কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের অফিস সম্পাদক আবদুল মালেক আহত হন। লাঠির আঘাতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ছাত্রশিবিরের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালান।

অন্যদিকে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের নেতারা দাবি করেন, বহিরাগত ছাত্রশিবির কর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে এসে উসকানিমূলক আচরণ করেন এবং এক কর্মীকে মারধর করেন। এর জের ধরেই সংঘর্ষ শুরু হয়।

ঘটনার পর ঢাকা কলেজের মূল ফটকসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস।

ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসায় সংঘর্ষ, আহত ২৫

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ২৫ জন আহত হয়েছেন।

সংঘর্ষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হকের মাথা ফেটে যায়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। পরে লাঠি, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ।

আহতদের মধ্যে ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বি রয়েছেন। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা জানান, আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ ক্যাম্পাসে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দীর্ঘদিনের বিরোধী অবস্থানে থাকা ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দুই সংগঠনের নেতাকর্মীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ করে আসছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি ক্যাম্পাসে সংগঠন দুটির মধ্যে উত্তেজনার ঘটনা সামনে আসে।

শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না: শিক্ষামন্ত্রী

একাধিক ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। শিক্ষামন্ত্রী অধ্যাপক আনম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।

তিনি বলেন, পড়ালেখার পরিবেশ নষ্ট করে যারা সংঘর্ষে জড়াবে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments