১১১ কোটি টাকার জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রকল্পে অস্বাভাবিক লুটপাটের অভিযোগ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নিউজ২৪-এর সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য মাসুদা খাতুন (মাসুদা লাবনী) প্রাণনাশের হুমকির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ডিআরইউ।
সংগঠনটি অভিযোগের দ্রুত তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংবাদিক মাসুদা লাবনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
ডিআরইউর কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে মঙ্গলবার সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল এক বিবৃতিতে এ দাবি জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিভিন্ন সময় হুমকি, হয়রানি ও হামলার শিকার হচ্ছেন। সর্বশেষ সাংবাদিক মাসুদা খাতুনকে ধারাবাহিকভাবে মোবাইল ফোনে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
ডিআরইউর বিবৃতিতে এ ঘটনায় তেজস হালদার যশের বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
যে প্রতিবেদন নিয়ে উত্তেজনা
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্য গণভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পের নির্মাণ ও সংস্কারকাজে বড় অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে।
প্রকাশ্য তথ্য অনুযায়ী, জাদুঘরের দুটি প্রকল্পে মোট ১১১ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজের জন্য ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা এবং সিভিল বা নির্মাণকাজের জন্য ৭০ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ নিয়েই মূল প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।
বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক কাজের জন্য মেসার্স শুভ্রা ট্রেডার্স এবং সিভিল কাজের জন্য দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে নিউজ২৪-এর সাংবাদিক মাসুদা লাবনী।
সরাসরি ক্রয় নিয়ে প্রশ্ন
নিউজ২৪-এর সাংবাদিক মাসুদা লাবনীর পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়—জাদুঘর নির্মাণ ও সংস্কারের মতো কাজে উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি কেন গ্রহণ করা হলো। একই সঙ্গে কোন প্রক্রিয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দুটি নির্বাচন করা হয়েছে এবং কার্যাদেশের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
তবে প্রায় ১১১ কোটি টাকার সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ায় যে প্রশ্ন উঠেছে, তার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা ও নথিপত্র প্রকাশের দাবি রয়েছে।
মাসুদা লাবনীর প্রতিবেদনে কী ছিল
নিউজ২৪-এর সাংবাদিক মাসুদা লাবনী এ প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয়, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন করেন বলে ডিআরইউর বিবৃতি ও সংশ্লিষ্ট অভিযোগ থেকে জানা যায়। প্রতিবেদনের মূল আলোচনায় ছিল—১১১ কোটি টাকার প্রকল্পে অর্থ ব্যয়ের ধরন, কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে কি না।
একটি সরকারি প্রকল্পের ব্যয় ও ক্রয়প্রক্রিয়া নিয়ে সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা পেশাগত দায়িত্বের অংশ। কিন্তু ওই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে।
ধারাবাহিক ফোনে গালিগালাজ ও হুমকির অভিযোগ
ডিআরইউর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মাসুদা খাতুনকে মোবাইল ফোনে ধারাবাহিকভাবে গালিগালাজ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটির নেতৃবৃন্দের ভাষ্য, পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কোনো বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ বা প্রচারের কারণে একজন সাংবাদিককে ভয়ভীতি দেখানো স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য সরাসরি হুমকি।
তারা বলেন, এ ধরনের ঘটনায় শুধু একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তাই বিঘ্নিত হয় না, বরং মুক্ত গণমাধ্যমের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
হুমকির ঘটনায় জিডি
ঘটনার পর সাংবাদিক মাসুদা খাতুন সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে ডিআরইউ জানিয়েছে। সংগঠনটি ওই অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে হুমকিদাতার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সাংবাদিক মাসুদা লাবনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাংবাদিককে হুমকি স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য উদ্বেগের
ডিআরইউ নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখা যাবে না। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।একই সঙ্গে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ, ১১১ কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেমন সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব, তেমনি সেই প্রতিবেদনের কারণে সাংবাদিক হুমকির শিকার হলে তার প্রতিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব।



