নেপালে পাহাড় ধস-বন্যায় নিহত ১৬৫, নিখোঁজ প্রায় দেড় হাজার

ভয়াবহ দুর্যোগে লণ্ডভণ্ড নেপাল-তিব্বত সীমান্ত: হিমবাহ ধসেই সৃষ্টি ধ্বংসাত্মক ঢল, চলছে হেলিকপ্টারে উদ্ধার অভিযান

হিমালয়ের কোলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপর্যস্ত নেপাল। চীন সীমান্তবর্তী উত্তরাঞ্চলে হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত নেমে এসে নদীর গতিপথে ভয়াবহ ঢল সৃষ্টি করে। মুহূর্তের মধ্যে সেই স্রোত ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও বিভিন্ন স্থাপনা।

বুধবার (২৬ আগস্ট) শুরু হওয়া এ দুর্যোগে নেপালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটিতে ৮২৬ জন নিখোঁজ বা নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন। নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি নাগরিক বলে জানিয়েছে নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ।

তবে নেপালের বিভিন্ন অঞ্চলের সর্বশেষ পুলিশ হিসাব উদ্ধৃত করে কিছু প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ১৭৭ জনে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। ফলে উদ্ধারকাজ চলমান থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, সীমান্তের অপর পাশে চীনের তিব্বত অঞ্চলের গিরং কাউন্টিতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। সেখানে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের হিসাব মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০-এর কাছাকাছি।

কীভাবে ঘটল এত বড় বিপর্যয়

প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে বড় ধরনের ভূমিধস নেমে এসে নদীর পানি আটকে যায় এবং পরে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরবর্তী ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সেই ধারণা পাল্টেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল কারণ ছিল হিমবাহের একটি বড় অংশের ধস এবং এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নিচে নেমে আসা। এই ধস নদী উপত্যকায় প্রবল ধ্বংসাত্মক প্রবাহ তৈরি করে। পরে সেই পানি, বরফ, কাদা ও পাথরের মিশ্র স্রোত অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিচের দিকে ছুটে গিয়ে আকস্মিক বন্যায় রূপ নেয়। ভূমিকম্প এ ঘটনার মূল কারণ ছিল না।

অর্থাৎ ঘটনাটি সাধারণ বর্ষাকালীন বন্যার মতো নয়। বরং পাহাড়ের ওপর থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথর ধসে পড়ে নদী ব্যবস্থায় এক ধরনের হঠাৎ সৃষ্ট ধ্বংসাত্মক জল-ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ তৈরি হয়। সংকীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে সেই প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসায় মানুষজন নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সময়ও পায়নি।

কোন কোন এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত

নেপালের রাসুয়া জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরে ভয়াবহ ঢল নেমে আসে নুয়াকোট, ধাদিংসহ আরও কয়েকটি জেলায়। ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি ও কাদার প্রবল স্রোত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়।

বন্যার পানিতে ও কাদায় বহু বাড়িঘর, যানবাহন ও অবকাঠামো চাপা পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গম এলাকাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

রয়টার্স জানিয়েছে, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৯টি মোটরচালিত সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দুর্গত এলাকায় স্থলপথে উদ্ধারকারী দল ও ত্রাণ পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিখোঁজদের বড় অংশ বিদেশি পর্যটক

দুর্যোগের সময় নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী অঞ্চলটি ছিল তীর্থযাত্রী ও পর্যটকে পূর্ণ। বিশেষ করে তিব্বতের কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় থাকা অনেক মানুষ ওই এলাকায় ছিলেন।

নেপালে নিখোঁজ ৮২৬ জনের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন বিদেশি। নিখোঁজ বিদেশিদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৬৩ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন বলে জানা গেছে। আরও বেশ কয়েকটি দেশের নাগরিক নিখোঁজ তালিকায় রয়েছেন।

তিব্বতের গিরং কাউন্টিতেও নিখোঁজ ৫৫৮ জনের মধ্যে অন্তত ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক বলে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে।

কীভাবে চলছে উদ্ধার অভিযান

ভয়াবহ দুর্যোগের পর নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থলপথে পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় হেলিকপ্টারকে উদ্ধার অভিযানের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গিয়ে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধার করছে। একই সঙ্গে দুর্গতদের জন্য তাঁবু, খাবার, ওষুধসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার উদ্ধার অভিযানে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।

রয়টার্সের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবারই হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ১২৫ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ২০ জন বিদেশি নাগরিক। দুর্গম এলাকায় আটকে পড়া মানুষদের শনাক্ত ও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

উদ্ধারকাজে বড় বাধা কাদা ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। অনেক জায়গায় কয়েক ফুট পর্যন্ত কাদা জমে গেছে। কোথাও রাস্তা ও সেতু সম্পূর্ণ ভেসে গেছে, আবার কোথাও পাহাড়ি ঢালে নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

এ কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দল সরাসরি প্রবেশ করতে পারছে না। হেলিকপ্টার দিয়েও সব জায়গায় অবতরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে আটকে পড়া মানুষদের কাছে খাবার ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছানো এবং নিখোঁজদের সন্ধান—দুটিই কঠিন হয়ে পড়েছে।

আবারও বন্যার আশঙ্কা

উদ্ধারকাজের মধ্যেই নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি নদীতে ধস ও ধ্বংসাবশেষ জমে কোথাও কোথাও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে নতুন করে পানি জমে গিয়ে হঠাৎ আরেক দফা ঢল নামার ঝুঁকি রয়েছে।

চীনের তিব্বত অংশে একটি বাঁধসদৃশ জলাধার তৈরি হওয়া নিয়েও সতর্কতা রয়েছে। সেখানে পানির চাপ ও নদীর গতিপথ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা

ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রতিবেশী ভারত জরুরি ত্রাণ ও সরঞ্জাম পাঠিয়েছে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সহায়তার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আরও বাড়তে পারে প্রাণহানি

নেপালের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে এখনো অনেক মানুষ নিখোঁজ। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও নদীর তলদেশে আটকে থাকা মানুষদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে। ফলে উদ্ধার অভিযান যত এগোবে, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে নেপালে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যুর তথ্য এবং ৮২৬ জন নিখোঁজের সরকারি হিসাব সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু সর্বশেষ পুলিশ আপডেটে মৃতের সংখ্যা ১৭৭ বলা হয়েছে। অন্যদিকে তিব্বতে আরও ৫৫৮ জন নিখোঁজ। তাই পুরো দুর্যোগে মৃত ও নিখোঁজের প্রকৃত সংখ্যা এখনও চূড়ান্ত নয়।

হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট আকস্মিক এই বন্যা শুধু প্রাণহানি নয়, নেপাল-তিব্বত অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ, পর্যটন, বিদ্যুৎ ও সীমান্ত অবকাঠামোকেও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলেছে। নিখোঁজদের সন্ধান ও দুর্গতদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়াই এখন নেপাল সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments