রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়াসহ অন্যান্য জেলাগুলোতে পুরোদমে শুরু হয়েছে আলু উত্তোলন। আলু বিক্রি করে কৃষকরা এবার আবাদ খরচও তুলতে পারছেন না। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে বস্তা সংকট। এছাড়া জ্বালানি সংকটে জমি থেকে আলু তুলে হিমাগারে নিতে মিলছে না পরিবহণ।
রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁ, জয়পুরহাট ও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের আলু আবাদ প্রধান জেলাগুলোতে বস্তার জন্য রীতিমত হাহাকার পড়েছে। এই সংকটের অজুহাতে মজুত ব্যবসায়ীরা জমি থেকে সরাসরি আলু কিনছেন না। তবে তারা ফড়িয়া দালালের মাধ্যমে জমির আলু কিনছেন পানির দরে।
আলু চাষিরা বলছেন, এক সপ্তাহ আগেও জমিতে নতুন আলু বিক্রি হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা কেজি দরে। কিন্তু বস্তা নেই অজুহাতে মজুত ব্যবসায়ীরা জমি থেকে সরাসরি আলু কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে আলুর দামে বিপর্যয় নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার জমিতে আলু বিক্রি হয়েছে ১২-১৩ টাকা কেজি দরে। তবে এক কেজি আলু ফলাতে তাদের খরচ হয়েছে ১৩ থেকে ১৪ টাকা। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া ৮ টাকা যোগ হবে। সঙ্গে রয়েছে পরিবহণ খরচ। সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা।
আলুচাষিদের অভিযোগ, আলু তোলার মৌসুম শুরু হওয়ার পর রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলজুড়ে বস্তা সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে। কম দামে আলু কিনতেই রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় কৃত্রিমভাবে বস্তা সংকট তৈরি করেছে হিমাগার মালিক, জুট মিলসের মালিক-কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মৌসুমি মজুত ব্যবসায়ী ও ফড়িয়ারা।
গত বছর যে বস্তার দাম ছিল ৭০ থেকে ৮০ টাকা সেই বস্তা এবার চাষিদের কিনতে হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯৫ টাকায়। এক সপ্তাহ আগে বস্তার অর্ডার করলে মিলছে দশ দিন পর। স্থানীয় কয়েকটি জুট মিলস বস্তা তৈরি ও সরাসরি সরবরাহ করে আসছিল চাষিদের কাছে। কিন্তু এবার বস্তা বিক্রি ও সরবরাহে ঢুকে পড়েছে সিন্ডিকেট।
জানা গেছে, রাজশাহী ও আশেপাশের জেলাগুলোর আলুচাষিরা বস্তা কিনতে ছুটছেন বগুড়া, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দূরের জেলায়। তবুও মিলছে না পর্যাপ্ত বস্তা। জ্বালানি সংকটের কারণে বস্তা আনার পরিবহণও মিলছে না।
আবার এর ভাড়াও তিনগুণ হয়েছে। ফলে চাষিরা আলু তুলে জমিতেই ফেলে রাখছেন সাত দিন বা আরও বেশি সময়। কোনোভাবে বস্তা সংগ্রহ হলেও জ্বালানি সংকটে ট্রাক্টর-ট্রলি বা হ্যারো জাতীয় ছোট যানবাহন চলাচল সীমিত হয়েছে। ফলে আলু নেওয়া যাচ্ছে না হিমাগারে। এমন পরিস্থিতিতে চাষিরা জমিতেই পানির দামে ফড়িয়া দালালদের কাছে আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
রাজশাহীর তানোরের আলুচাষি শরিফুল ইসলাম জানান, গত বছর আলু আবাদ করে সাড়ে তিন লাখ টাকা লোকসান করেছি। এবার আলু আবাদ কিছুটা কম হওয়ায় ভালো দামের আশায় সাড়ে ছয় বিঘাতে আলু করেছিলাম। যদিও আলুর ফলন কিছুটা কম হয়েছে।
চলতি মৌসুমে বিঘাতে আলুর ফলন হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ মন। বৈরী আবহাওয়ার কারণে দ্রুত জমি থেকে আলু তুলে হিমাগারে নেওয়া জরুরি হলেও বস্তা সংকটে চাষিরা চরম বিপাকে পড়েছে। এবার দ্বিগুণ দামেও বস্তা মিলছে না। চাষিরা আলু তুলে জমিতে ফেলে রাখছেন। ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম। বৃষ্টি হলেই সব আলু পচে নষ্ট হবে। তাই চাষিরা যে দাম পাচ্ছেন সেই দামেই জমি থেকে আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ন্যূনতম খরচটাও উঠছে না।
নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বার আলুচাষি নবাব আলী জানান, বস্তা সংকটের সঙ্গে হিমাগার মালিক, আলুর মজুত ব্যবসায়ী ও জুট মিলগুলোর সিন্ডিকেট একসঙ্গে কাজ করছে। চাষিদের বিপাকে ফেলে পানির দামে আলু কিনে নেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। আগামীতে আলুর দাম না বাড়লে পুরোটাই লোকসান গুনতে হবে। এতে হাজার হাজার আলুচাষি পথে বসবে। আলুচাষিদের পাশে কেউ নেই। না প্রশাসন না কৃষি বিভাগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে ছোট-বড় মিলে প্রায় ৩৬টি হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারের একেকটির একেক রকম সংরক্ষণ সক্ষমতা রয়েছে। মোট ৩৬টি হিমাগারে গড়ে ৬ লাখ বস্তা করে আলু সংরক্ষণ করা যায়। এই হিসাবে শুধু রাজশাহীতেই ২ কোটি ১৬ লাখ বস্তার প্রয়োজন।
অন্যদিকে রাজশাহী ও আশপাশের এলাকায় সরকারি-বেসরকারি মিলে ৬টি জুট মিল রয়েছে। এসব জুট মিলের মোট উৎপাদন ক্ষমতা দেড় কোটি বস্তা। এছাড়া একাধিক হিমাগার মালিকের নিজস্ব জুট মিলও রয়েছে। বাকি বস্তা আসে দেশের বিভিন্ন এলাকার জুট মিলস থেকে। কিন্তু জ্বালানি সংকটে বাইরের জেলা থেকে বস্তা আমদানি প্রায় বন্ধ রয়েছে।
আর এই সুযোগে হিমাগার মালিক, জুট মিলস মালিক ও মৌসুমি মজুত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে বস্তার দাম বাড়িয়েছে দ্বিগুণ-তিনগুণ করে। এই বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান জানান, কোথাও কোথাও বস্তা সংকট আছে বলে শোনা যাচ্ছে। সমস্যাটা প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক। গত বছরের তুলনায় এবার আলুর আবাদ কিছুটা কমেছে। আলু সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন পদক্ষেপ নিলে চাষিদের সুবিধা হবে। ঝড়-বৃষ্টির মৌসুম হওয়ায় চাষিরা দ্রুত জমি থেকে আলু তুলে ফেলছেন।
রাজশাহী হিমাগার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, বস্তা সংকট হচ্ছে জ্বালানি সংকটের কারণে। ফলে আলুচাষিরা কিছুটা সমস্যায় আছে। এতে কোনো সিন্ডিকেট কাজ করছে না বলে তিনি দাবি করেন।



