জাতীয় নির্বাচনে সর্বাধুনিক বডি ওর্ন ক্যামেরা (বডিক্যাম) ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ ও কেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের দেহে এসব ক্যামেরা বসানো থাকবে। সারা দেশে ৪৭ হাজার ভোটকেন্দ্রের জন্য এরই মধ্যে ৪০ হাজার বডিক্যাম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ক্যামেরা কেনার প্রক্রিয়া এখনো খুব বেশি দূর অগ্রসর হয়নি। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের আগে মানসম্মত ও কার্যকর বডি ওর্ন ক্যামেরা সংগ্রহ করা যাবে কিনা-তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শিগগিরই সঠিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (ফিচার) ক্যামেরা নির্বাচন করা না হলে, শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নি¤œমানের যন্ত্র সরবরাহের আশঙ্কা তৈরি হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, পুলিশের কাজে স্বচ্ছতা আনতে সর্বাধুনিক বডি ক্যামেরা সংযোজনের সুপারিশ করা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই এই বডিক্যাম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে এসব ক্যামেরা ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব ক্যামেরায় ভিডিও, অডিও, অ্যালার্ম সিস্টেম থাকবে। এই ডিভাইসের মাধ্যমে ভিডিও ধারণের পাশাপাশি সরাসরি দেখারও ব্যবস্থা থাকবে। ভোটকেন্দ্রে পুলিশের বডি ক্যামেরারে মাধ্যমে পাওয়া ভিডিও ৩টি স্থান থেকে পর্যবেক্ষণ করা হবে। এরমধ্যে সংশ্লিষ্ট থানা থেকে পুলিশ ফোর্সের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হবে। পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জেলায় সক্রিয় সবগুলো বডি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর সারাদেশে বডিক্যাম কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে। কোনো ভোটকেন্দ্র বা এলাকায় সমস্যা দেখা দিলে এই বডিক্যামের মাধ্যমে থানা, জেলা ও কেন্দ্রিয় মনিটরিং সেন্টারে সঙ্কেত পাঠাবে। শুধু তাই নয়, বডি ক্যামেরায় মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সহজ হবে। এই প্রযুক্তির কারণে কেন্দ্রদখল, জাল ভোটসহ পেশীশক্তির মাধ্যমে ফলাফলে প্রভাবিত করার আশঙ্কা অনেকটা কমে যাবে বলে।
একশ কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ ঃ
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, এর আগে ২০২১-২২ সালে পুলিশের জন্য প্রায় ১০ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরা কেনা হয়েছিল। তবে স্থানীয় সরবরাহকারীরা চীনের প্রতিষ্ঠান ডয়িমন্তের তৈরি নি¤œমানের বডি ক্যামেরা গছিয়ে দেওয়ায় তা কাজে আসেনি। দামের তুলনায় এই বডিক্যামের গুণগত মান প্রশ্ন ওঠেছিল। দাম পড়েছিল ৮০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ইতোমধ্যে বডি ক্যামেরা সরবরাহের জন্য ৬টি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো স্মার্ট টেকনোলজিস (হুয়াওয়ে প্রতিনিধি), এমডিএম (মটোরোলার প্রতিনিধি), হিকভিশন, হাইটেরা এবং ডাহুয়া সিকিউরিটি। স্মার্ট টেকনোলজিস (হুয়াওয়ে প্রতিনিধি) নিজেস্ব কোনো বডিক্যাম নেই। তারা টিডিটেক থেকে বডিক্যাম তৈরি করে নেবে। ইতোমধ্যে এসব প্রতিষ্ঠান আলাদা আলাদাভাবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির কাছে প্রস্তাবনা উপস্থাপন ও যন্ত্র প্রদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বডিক্যাম সরবরাহে আগ্রহীদের মধ্যে সাবেক সরকারের আমলে বিতর্কিত ২টি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। স্মার্ট টেকনোলজি এবং এমডিএমও রয়েছে। সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের যোগশাজশে এমডিএম (মটোরোলার প্রতিনিধি) পুলিশের রেডিও ডিভাইস সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় অনিয়মের মাধ্যমে একশ’ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্র অতীতের মতো এবারও ম্যানেজ করার চেষ্টা করছে। উল্লেখ্য এই প্রতিষ্ঠানটি সাবেক আইজিপি বেনজির আমলে পুলিশের টেলিকমের ৪২টি টেন্ডারের মধ্যে ৪১টির কাজ পেয়েছিল। আন্তর্জাতিক বিবেচনায় ৪/৫ গুণ বেশি মূল্যে মানহীন পণ্য দিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোপাট করেছে।
মানসম্মত বডিক্যাম নিয়ে বদ্ধপরিকর সরকার ঃ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তিগত নানা দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বডি ক্যামেরা চূড়ান্ত করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী বিষয়টি তদারকি করছেন। বডি ক্যামেরা সংগ্রহের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রাথমিক কমিটি গঠন করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বকশ চৌধুরী ও ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ছাড়াও এই কমিটিতে আছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব, পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ফাইন্যান্স), অতিরিক্ত আইজিপি (লজিস্টিকস অ্যান্ড অ্যাসেট একুইজিশন), অতিরিক্ত আইজিপিসহ (পুলিশ টেলিকম) কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশ টেলিকমের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অতীতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় বডি ক্যামেরা ক্রয় প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসন সংশ্লিষ্ট হতে চাইছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় এটা দেখভাল করছে।



