জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আজ। দীর্ঘ প্রায় ৩৩ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। ইতোমধ্যে ভোটপ্রদানকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা প্রার্থী নির্বাচনের হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত। এর আগে, গত ২৯ আগস্ট বিকাল ৪টা থেকে প্রচারণা শুরু হয়ে এবং ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় শেষ হয়। ভোটের প্রচারণার শেষদিন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছাতে দিনরাত ছুটেছেন প্রার্থীরা। তারা এখন বেশ উৎকন্ঠায় ক্ষণ গুনছেন নির্বাচনের ফলাফলের উপর।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার রয়েছেন ১১ হাজার ৭৮৩ জন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মোট ৬২৩ জন প্রার্থী। এর মধ্যে কেন্দ্রীয় সংসদে ২৫ পদের বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৭৮ জন। হল সংসদে ২১ টি হলের প্রতিটিতে ১৫ টি করে মোট ৩১৫ পদের পদের বিপরীতে ৪৪৫ জন প্রার্থী নির্বাচন করছেন। কেন্দ্রীয় সংসদে ৮ টি প্যানেলে ১৩১ জন এবং বাকি ৪৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এছাড়া হল সংসদে ৬৪ টি পদে কোন প্রার্থী নেই এবং ১২৪ টি পদে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন।
নির্বাচনে চারটি পূর্ণাঙ্গ ও চারটি আংশিক প্যানেল গঠিত হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ প্যানেলগুলো হলো- শিবির সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’, বাগছাস সমর্থিত ‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’, ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেল, ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেল। এছাড়া আংশিক প্যানেলের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট সতর্থিত ‘সতন্ত্র অঙ্গিকার পরিষদ’, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ে ‘স্বতন্ত্র ঐক্য সম্মিলন’, ছাত্র ইউনিয়ন (অন্য অংশ) সমর্থিত ‘সংসপ্তক’ ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) সমর্থিত প্যানেল।
নির্বাচন কমিশন
জাকসু নির্বাচন পরিচালনার জন্য ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামানকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও বিশ^বিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক এ.কে.এম. রাশিদুল আলমকে সদস্য সচিব করে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন- জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাফরুহী ছাত্তার, শহীদ তাজউদ্দিন আহমেদ হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক খোঃ লুৎফুল এলাহী ও বেগম সুুফিয়া কামাল হলের প্রভোস্ট রেজওয়ানা কবির ¯িœগ্ধা।
প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট
জাকসুর শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে সকল প্রার্থীর বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। ফলে বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন গতকাল (৯ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ৯ টা থেকে রাত ৭ টা পর্যন্ত ডোপ টেস্টের কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এতে কেন্দ্রীয় সংসদের ১৬৩ জন ও হল সংসদের ৪০৩ জন প্রার্থী ডোপ টেস্ট করার জন্য নমুনা দিয়েছেন। তবে যেসকল প্রার্থী ডোপ টেস্ট করাননি বা নমুনা দেননি এবং যাদের রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে তাদের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিবে।
নিরাপত্তা সংক্রান্ত
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ও ক্যাম্পাসের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন পুলিশ বাহিনী ও আনসার দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীরাও দায়িত্ব পালন করছেন। বিশ^বিদ্যালয়ের ১২ টি গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। যাতে কোন বহিরাগত প্রবেশ করতে না পারে। সকল শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক বিশ^বিদ্যালয় কার্ড বহন করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাইরে থেকে আগত বিভিন্ন প্রেস ও মিডিয়ার কর্মীসহ পর্যবেক্ষক পরিষদ এর সদস্যদের জাকসুর নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বিশেষ আইডি প্রদানের মাধ্যমে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যাদের ছাত্রত্ব শেষ নিরাপত্তার স্বার্থে এদিন বেলা ১২টার মধ্যে তাদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এছাড়া যেকোন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ক্যাম্পাসের বাইরে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাব ও পুলিশের স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
বুথ ও ভোটকেন্দ্র
ভোট গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১টি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ভোট গ্রহণের জন্য কেন্দ্রগুলোতে মোট ২২৪ টি বুথ স্থাপন করা হয়েছে। ভোটগ্রহণ পরিচালনার জন্য নিয়োগ করা হয়েছে ৬৭ জন পোলিং অফিসারসহ ২১ জন রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচনে পোলিং ও রিটার্নিং অফিসার হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই দায়িত্ব পালন করবেন। ব্যালট পেপারে টিক চিহ্নের মাধ্যমে ভোট দিতে হবে। প্রতি ২০০ ব্যালট পেপারের জন্য একটি বাক্স থাকবে। কেন্দ্রীয় সংসদ ও হল সংসদের ব্যালট বাক্স আলাদা করে চিহ্নিত থাকবে।
ওএমআর ব্যালটে ভোট
এবারের নির্বাচনে একজন ভোটারকে কেন্দ্রীয় ও হল সংসদ মিলিয়ে মোট ৪০ টি ভোট দিতে হবে। এ বিষয়টি বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন ওএমআর ব্যালটে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। একটি বিশেষায়িত কোম্পানির মাধ্যমে ব্যালটগুলো ছাপানো হবে। এমনকি ব্যালটগুলো রিডেবল হবে। ভোটের ফলাফল মেশিনের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি করা হবে।
পদ থেকে সরে দাড়িছেন এক জিএস প্রার্থী
ভোট গ্রহণের দুই দিন আগে নির্বাচনের জিএস পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দা অনন্যা ফারিয়া। তিনি গত ২৮ আগস্ট ছাত্রদল সমর্থিত প্যানেলে প্রত্যাশিত পদ না পাওয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে (জিএস) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দেন। পরে গত ৯ সেপ্টেম্বর তিনি ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সম্পীতি ও ঐক্যে’র ডাক দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। কিছু সূত্র জানান, সৈয়দা অনন্যা ফারিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করায় তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাড়ান। যদিও তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেন।
ভিপি পদে প্রার্থীতা বাতিল
বৈধ ছাত্রত্ব না থাকায় ছাত্র ইউনিয়ন (একাংশ) সমর্থিত ‘সম্প্রীতির ঐক্য’ প্যানেলের মনোনীত ভিপি পদপ্রার্থী অমর্ত্য রায় জনের প্রার্থীতা বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তীতে তিনি আদালতে প্রার্থীতা পূর্ণবহালের জন্য রিট করে। আদালত তার রিটের ভিত্তিতে প্রার্থীতা বাতিলের বিষয়টিকে অবৈধ ঘোষণা করে তার পক্ষে রায় দেন। পরে এ রায়ের বিরুদ্ধে চেম্বার জজের আদালতে আপিল করে নির্বাচন কমিশন। পরবর্তীতে চেম্বার জজ হাইকোর্টের আদেশ স্থগীত করে। এতে তার প্রার্থীতা বাতিলের বিষয়টি বহাল থাকে। এর ফলে গত ৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯ টা থেকে ভোর সাড়ে ৪ টা পর্যন্ত বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ভিসিসহ নির্বাচন কমিশনকে অবরুদ্ধ করে রাখে সেই প্যানেলের অন্য প্রার্থী ও সমর্থকেরা। এমনকি এসময় সাধারণ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের প্রবেশেও বাধা সৃষ্টি করে।
উল্লেখ্য, দুই পিছিয়েও গত ১০ আগস্ট জাকসু নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত তপশিল অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২১ তারিখ মনোনয়ন সংগ্রহ, প্রার্থীদের যাচাই-বাচাই শেষে ২৯ আগস্ট চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ২৯ আগস্ট থেকে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে নির্বাচনী প্রচারণা। সবশেষ দীর্ঘ ৩৩ বছর পর এক নতুন ভোরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়। আজ , ১১ সেপ্টেম্বর ভোটগ্রহণ।



