অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে ৪০ জন বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডের শিকার

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাÐের অভিযোগ এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে। নিহত ৪০ জনের মধ্যে ১৯ জনকে গুলি, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং সাতজনকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার পর চলতি বছরের অক্টোবর মাসে দেশে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার এবং কারা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অক্টোবর মাসে মোট ৬৬টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার হয়েছে। এটি অনাকাঙ্খিতই নয়; বরং নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত মাসে (সেপ্টেম্বর) এর সংখ্যা ছিল ৫২। এসব অজ্ঞাতনামা লাশের বেশির ভাগই নদী বা ডোবায় ভাসমান, মহাসড়ক বা সড়কের পাশে, সেতুর নিচে, রেললাইনের পাশে, ফসলি জমিতে ও পরিত্যক্ত স্থানে পাওয়া যায়। অল্পসংখ্যক মৃতদেহ গলাকাটা, বস্তাবন্দী ও রক্তাক্ত বা শরীরে আঘাতের চিহ্নসংবলিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ি, অক্টোবরে কারা হেফাজতে মোট ১৩ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে এ সংখ্যা ছিল ৮ জন। অক্টোবর মাসে ছয়জন কয়েদি ও সাতজন হাজতির মৃত্যু হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও এমএসএফের দেয়া প্রতিবেদন নিয়ে বিবিসি বাংলা বলেছে, ‘বিচারবহির্ভূতভাবে গুম-খুনের জন্য ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। গণআন্দোলনের মুখে পতন হয় সেই সরকারের। নতুন করে সরকার পরিচালনার জন্য শপথ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই সেসময় হওয়া বিচার বহির্ভূত হত্যাকাÐসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে বেশ সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয় তারা। বন্ধ করা যায়নি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাÐ।’
বেড়েছে অজ্ঞাত লাশ ঃ
এমএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অজ্ঞাত লাশ উদ্ধারের ঘটনা বেড়েই চলেছে এবং তা জনজীবনের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি জোরালোভাবে সবার সামনে প্রতিফলিত হচ্ছে। পাশাপাশি অজ্ঞাত লাশের পরিচয় উদ্ধারে অপারগতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভ‚মিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১টি শিশু, ১ কিশোর, ১১ জন নারী ও ৫৩ জন পুরুষের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৭ বছর বয়সী শিশু; ১৫ বছর বয়সী কিশোর; ২০ থেকে ৩০ বয়সী ১৫ জন পুরুষ ও ২ জন নারী; ৩১ থেকে ৪০ বয়সী ১৯ জন পুরুষ ও ৬ জন নারী; ৪১ থেকে ৫০ বয়সী ১ নারী ও ৫ জন পুরুষ এবং ৫০ বছর বয়সের বেশি ১১ জন পুরুষ ও ১ নারী রয়েছেন। এর মধ্যে অজ্ঞাতনামা তিনজনের বয়স শনাক্ত করা যায়নি।
এমএসএফ বলেছে, শুধু অজ্ঞাত লাশ উদ্ধার হয়েছে বলে জানিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং পরিচয় জানার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। পরিচয় উদ্ধার করে হত্যাকাÐের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।
কারা হেফাজতে মৃত্যু বেড়েছে ঃ
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ি, কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চারজন কয়েদি ও দুজন হাজতি, গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে একজন কয়েদি ও শেরপুর জেলা কারাগারে একজন কয়েদি মারা যান। এ ছাড়া খুলনা জেলা কারাগারে, টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে, চট্টগ্রাম জেলা কারাগারে, সিরাজগঞ্জ কারাগারে ও মানিকগঞ্জ জেলা কারাগারে একজন করে হাজতি বন্দী মারা যান। সব বন্দীর মৃত্যু হয় কারাগারের বাইরে হাসপাতালে।
এমএসএফের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র তুলে ধরে। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই লাশ উদ্ধার করেই ক্ষান্ত হচ্ছে। কিন্তু এসব লাশ উদ্ধার করে তার পরিচয় শনাক্ত করা এবং সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত করে মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন করাই শুধু নয়, এসব লাশ আত্মীয়-পরিজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া এসব বাহিনীর কাজ। কিন্তু একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু মামলা করা ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আর কোনো কাজ নেই। অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং হেফাজতে মৃত্যু বৃদ্ধি জনমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভ‚মিকা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করে।
গণপিটুনিতে হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়েছে ঃ
এমএসএফের প্রতিবেদন অনুযায়ি অক্টোবর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৪৯টি ঘটনার শিকার হয়েছেন ৫৪৯ জন। এর মধ্যে ২ জন নিহত এবং ৫৪৭ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন গুলিবিদ্ধ এবং নিহত ব্যক্তিরা বিএনপির কর্মী সমর্থক। সেপ্টেম্বর মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার ৩৮টি ঘটনা ঘটেছিল।
সহিংসতার ৪৯টি ঘটনার মধ্যে ১১টি ঘটনায় রাজনৈতিক বিরোধ ও সহিংসতাকে কেন্দ্র করে পার্টি অফিস, বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও অগ্নিকাÐ এবং ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। অক্টোবর মাসে মোট গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে ৪৪টি। আগের মাসে এ ঘটনা ঘটেছিল ৪৩টি। এ মাসে গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১২। আগের মাসে নিহত হয়েছিলেন ২৪ জন।
বিচারবর্হিভ‚ত হত্যা থেমে নেই ঃ
অধিকার-এর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর অর্থাৎ গত তিন মাসেই ১১টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাÐ ঘটেছে, মোট হিসাব করলে মাসপ্রতি যার গড় সংখ্যা দাঁড়ায় তিন। একইসময়ে কারাগারে মৃত্যু হয়েছে ৮৮ জনের।
এর আগে, মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। জুলাইয়ে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও অতীতের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনে নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও অন্যায়ভাবে আটক করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না।
অন্যদিকে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে আইনের বাইরে কাজ বা তৎপরতাকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও এই ধরনের ঘটনা ঘটার কারণ হিসেবে দেখছেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন। সরকার দৃঢ় অবস্থান না নেওয়ার কারণে এই ঘটনাগুলো ঘটছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সীমান্তে হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু ঃ
অধিকার-এর প্রতিবেদনে সীমান্তে হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যুসহ আরও কিছু তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, চব্বিশের অগাস্ট থেকে পঁচিশের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কমপক্ষে ৩৫ জন বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে, যার মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে নিহত হয়েছেন ১০ জন।
গত মে মাস থেকে বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ভারত কমপক্ষে দুই হাজার ৩৩৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন করেছে বলেও মানবাধিকার সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। গত জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের, তাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে এই সংখ্যা ২৮১-এ পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের অগাস্ট থেকে পঁচিশের সেপ্টেম্বরের মধ্যে কমপক্ষে ৬৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে ভুক্তভোগীর এই সংখ্যা ১৮৮। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাচ্যুতির পর গতবছর আটই অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে গত সেপ্টেম্বরের মধ্যে অন্তত ১৫৩ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments