বুড়িগঙ্গার তীরে কেরানীগঞ্জে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীন কন্টেইনার টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় এতদিন পরিচালনা করা হলেও এখন তা যাচ্ছে নির্দিষ্ট একটি কোম্পানির হাতে। তবে বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার জন্য দায়িত্ব পেতে যাওয়া কোম্পানিটি নিয়ে উঠেছে নানা বিতর্ক। অভিযোগ রয়েছে, দেশীয় কোম্পানিগুলোকে সুযোগ না দিয়ে মেডলগ এসএ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে তাড়াহুড়ো করে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। নিয়ে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানগাঁও বন্দর ২২ বছরের জন্য মেডলগ এসএ নামের যে প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে তা নিতান্তই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতি। দেশের অভ্যন্তরে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা দক্ষতার সঙ্গে এই বন্দরের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার কাজ করতে পারে। কিন্তু তাদের বঞ্চিত করে অনেকটা তড়িঘড়ি করেই বিদেশিদের কাছে বন্দরের দায়িত্ব দিচ্ছে নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ। আর এর নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তাব্যক্তিদের নিজস্ব স্বার্থও জড়িত বলে জানিয়েছেন তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার পর পানগাঁও বন্দর দিয়ে ২০২৩ সালে ২৯ হাজার কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। এর পর থেকে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কমতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করে সরকার। এতে সংশ্লিষ্টদের ধারনা হয়, একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সরকার টার্মিনাল পরিচালনার নীতি গ্রহণ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি।
দেশীয় একাধিক সংগঠনের অভিযোগ, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অসচ্ছতা থাকায় দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠানই দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তারা সেটি পাননি। টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালে যেখানে একটি বিদেশী কোম্পানি এবং দুটি বাংলাদেশি কোম্পানি টেন্ডার এ অংশগ্রহণ করেছিল। সে সময় টেন্ডার চুড়ান্ত হবার আগেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মাননীয় উপদেষ্টা বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় খোলাখুলি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে একটি টেন্ডার চলাকালীন সময়ে যেখানে তিনটি কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছে সেখানে তারা জানালেন যে একটি বিদেশী কোম্পানিকে পানগাঁও টার্মিনালের দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে।
দেশীয় প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোর আরো অভিযোগ করে জানায়, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টেন্ডার আহ্বানের বিষয়টি শুধুমাত্র ‘আই ওয়াশ’। এখানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বরতরা আগেই ঠিক করে রেখেছেন যে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেয়া হবে। তাছাড়া বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যে বিদেশি কোম্পানিটির নাম প্রচার করা হয়েছে মেডিটার্নিয়ান শিপিং কোম্পানি বাস্তবে ওই সেটি অংশগ্রহণ করেনি। ওই কোম্পানির একটি শাখা মেডলগ এসএ টেন্ডারে অংশ নিয়েছে। যারা একেবারেই নতুন। তাদের কেবলমাত্র দু একটি নদীবন্দর রয়েছে।
জানা গেছে, গত ৬ই নভেম্বর টেন্ডারের টেকনিক্যাল ইভালুয়েশনের দিনক্ষণ নিধারিত ছিল। সেখানে তাড়াহুড়ো করে অপর কোম্পানিকে বাদ দেয়া হয়। কেবলমাত্র মেডলগ এসএকে রেসপনসিভ করে টেকনিক্যাল ইভালুয়েশন প্রতিবেদন সম্পন্ন করা হয়। আবার তাড়াহুড়ো করে ৯ই নভেম্বর টেন্ডারের ফিন্যান্সিয়াল ইভালিউশনের দিন ধার্য করা হয়। এই দুই কার্যদিবসে দুটি ইভালুয়েশন কমিটিই খুব তাড়াহুড়ো করে বিদেশি ওই কোম্পনিকে যোগ্য বলে বিবেচিত করে। একই সঙ্গে ১৭ই নভেম্বর পানগাঁও বন্দরের দায়িত্ব মেডলগ এসএকে দিয়ে চূড়ান্ত করার জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে।
সূত্রে আরও জানা যায়, পানগাঁও বন্দর রক্ষনাবেক্ষন ও পরিচালনা এবং ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে দেশিয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে টেন্ডারে অংশ নিয়েছিল এইচআর লাইন নামের একটি কোম্পানি। যার মালিকানা আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর। কিন্তু কোম্পাটির এই দরপত্রে অংশ নেয়া ছিল আনুষ্ঠানিকতা। কারণ পানগাঁও বন্দরের দায়িত্ব পেতে যাওয়া বিদেশি প্রতিষ্ঠান মেডলগ এসএ এর মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠান মেডিটেরিয়ান শিপিং এর বাংলাদেশের প্রতিনিধি হচ্ছে সাবের হোসেন চৌধুরীরই অন্য একটি প্রতিষ্ঠান Mediterranean Shipping Company Bangladesh Ltd।
নৌবন্দরগুলো থেকে বিদেশি আগ্রাসন দূর করতে এর আগে চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে নানা সভা সমাবেশ ও অনশন কর্মসূচি পালন করেন সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও নেতৃবৃন্দ। কিন্তু তাতেও টনক নড়েনি সরকারের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোটস অসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, সরকারকে লুটেরা শ্রেণি ঘিরে রেখেছে। একটি দেশিয় মাফিয়া চক্র বিদেশিদের হাতে বন্দরগুলো তুলে দিচ্ছে। এটা দেশদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছু নয়। তাদের বিচারের আওতায় আনা উচিৎ।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি আবদুল মাহবুব চৌধুরী বলেন, এতদিন কি খেয়ে বেঁচেছেন? এতদিন কি ভাত খাননি? তাহলে এখন কেন বিদেশিদের হাতে বন্দর তুলে দিতে হবে? এটা ধ্বংস ছাড়া আর কিছু নয়। বন্দরে এখন পন্য খালাস করতে ৬৬৫ টাকা লাগে। যা শতকরা হিসেবে ১২১ শতাংশ।



