ডেভিল হান্টে গ্রেফতার হচ্ছে সাধারণ মানুষও

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে পুলিশের গ্রেফতার অভিযান চলছে। অপরাধী, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, অস্ত্রবাজসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এর আগে পুলিশ দুই দফা অপারেশন ডেভিল হান্টে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ২৭ হাজার ৬৯ জনকে গ্রেফতার করে।

বিশেষ এই অভিযানের পাশাপাশি জুলাই-আগষ্ট আন্দোলন পরবর্তীতে দায়ের করা বিভিন্ন মামলা, ওয়ারেন্ট ও অভিযোগের মূলে গ্রেফতার হয় ৬০ হাজার। সব মিলিয়ে ৫ আগষ্ট পরবর্তী এ পর্যন্ত ৫শ ২৬ দিনে রাজনৈতিক বিবেচনায় ৮৮ হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন মামলায় সাধারণ মানুষ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলের সমর্থকদের গ্রেফতারের অভিযোগ রয়েছে।

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ শুরু হয়। ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত এই অভিযানে ১৫ হাজার ৯৩৬ জন গ্রেপ্তার হন। তবে এই অভিযানেও চিহ্নিত, পেশাদার ও বড় সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারের সংখ্যা খুবই কম। তা ছাড়া অস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যাও খুব বেশি নয়। এই সময়ে মোট অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে ২৩৬টি।
তবে ঢাকার অপরাধ জগতের বড় সন্ত্রাসী বা তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে তেমন কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। আবার যারা বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাÐের জন্য অস্ত্র ভাড়া দেয়, তাদের থেকেও উদ্ধারের ঘটনা খুব বেশি নেই।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ১ হাজার ৩৩৩টি এখনো উদ্ধার হয়নি। অবৈধ অস্ত্রও নির্বাচনে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চলমান অভিযানে সন্ত্রাসী ও অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে কোন নিরিহ মানুষ যদি গ্রেপ্তার হন অবশ্যই তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। কারও বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ না থাকলে তাকে গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই। নিরিহ মানুষ গ্রেপ্তারের কোন তথ্য আমাদের কাছে আসেনি। কেউ অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই সেটা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবো।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীর পাশাপাশি সমর্থকদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। কারণ, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের যেসব নেতা লুটপাট, গুম, খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজির সাথে জড়িত, তাদের প্রায় বেশিরভাগই পালিয়ে গেছে, আত্মগোপন করেছে এবং গ্রেফতার হয়েছে। সেক্ষেত্রে নিরাপরাধ সমর্থকদের গ্রেফতার করা হলে সামনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটি বিরূপ প্রভাব পড়বে।

কেস স্টাডি-১
পুলিশের অপারেশন ডেভিল হান্ট ফেজ-২ এর একটি অভিযানের কেসস্টাডিতে দেখা যায়, পিরোজপুরের ইন্দুরকানী উপজেলার সেউতিবাড়িয়া গ্রামের সেরাজ মোল্লার ছেলে মো. আলাউদ্দিন মোল্লা (৪৭) একজন হতদরিদ্র দিনমজুর। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক এবং জিআর ও টিআরের সুবিধাভোগী।

স্থানীয় পর্যায় দলীয় বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে মাঝে মধ্যে অংশ নিতেন। গত ২৭ ডিসেম্বর ইন্দুরকানী থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। বিষ্ফোরক দ্রব্য আইন, লুটপাট ইত্যাদি ধারায় তাকে একটি মামলার আসামী করে আদালতে সোপর্দ করার পর তাকে আটক করে রাখা হয়েছে। তার ছেলে সজিব জানান, তার পিতার জামিনের চেষ্টা করেও গত দুই সপ্তাহেও তাকে জেল হাজত থেকে মুক্ত করা যায়নি।

কেস স্টাডি-২
পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নের একপাই জুজখোলা গ্রামের লিটন সিকদারের ছেলে কিশোর রাকিবকে (১৬) স¤প্রতি গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসা হয়। রাকিবের বাবা লিটন সিকদারের অভিযোগ, ছেলেকে ডাকাতি মামলা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করা হবে বলে পুলিশ ভয় দেখায়। এ সময় তার কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে রাকিবকে চুরি মামলায় সন্ধেহজনক আসামী করে আদালতে চালান দেয়া হয়।

ওই গ্রামের একটি ঘরে গত ১৭ ডিসেম্বর সংঘটিত একটি চুরির ঘটনাকে মামলার ভিত্তি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। রাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ তিনি গত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে তিনি এখন জেল হাজতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অস্ত্রধারী, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী গ্রেফতারের পরও খুনোখুনি থেমে নেই। প্রতিদিন সারাদেশে বিভিন্ন ঘটনায় গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন হত্যার শিকার হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি তথ্য বলছে, গত এক বছরে অর্থাৎ ২০২৫ সালে এক বছরেই সারাদেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩জন নিহত হয়েছে। আর এতে আহত হয়েছে সাড়ে সাত হাজারেও বেশি মানুষ। এই সময়ে মব সহিংসতা, গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে অন্তত ১৬৮ জন। পুলিশ সদর দফতরের হিসাব অনুযায়ি গত জানুয়ারি মাসে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ২৭৬টি। এর মধ্যে বেশ কিছু রাজনৈতিক হত্যাকান্ড ঘটেছে।

এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, যারা ডেভিল বা যারা প্রকৃত অর্থে অপরাধী তাদেরকে গ্রেফতার করা হোক। দুই দফার ডেভিল হান্ট অভিযানে ২৭ হাজার গ্রেফতারের পরও এখনও আমরা খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি নিয়ন্ত্রনে আনতে পারিনি।

ডেভিল হান্টের নামে সাধারণ মানুষ বা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থকদের গ্রেফতার করা হলে সেটা তো যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্যে সম্পন্ন হবে না। সাধারণ মানুষকে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে বা মামলা বানিজ্যের জন্য যদি গ্রেফতার করা হয়, সেটা তো সরকারকে একবার ভেবে দেখতে হবে। এটা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments