উত্তরায় ফ্ল্যাটে আগুনে দুই পরিবারের শিশুসহ ৬ জন নিহত, ১৩ জন হাসপাতালে

রাজধানীর উত্তরার একটি সাততলা আবাসিক ভবনে দ্বিতীয় তলায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেশিশুসহ ৬ জনের ।ধোঁয়ার অসুস্থ হয়ে ১৩ জন ভর্তি হয়েছে হাসপাতালে।এই ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গতকাল শুক্রবার উত্তরা পশ্চিম থানার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডে ৩৪ নম্বর বাড়িতে এ দুর্ঘটনা ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী ও তাদের সন্তানসহ মোট তিনজন রয়েছেন। আগুনের কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশের ধারনা,রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত।পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যৌথভাবে বিষয়টি তদন্ত করছে।

যেভাবে আগুন :ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, সকাল ৭টা ৫৪ মিনিটে খবর পেয়ে উত্তর ফায়ার স্টেশন থেকে দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলের উদ্দেশে রওয়ানা দেয়। ফায়ার সার্ভিসের ইউনিটগুলো সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। প্রায় আধাঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। পরে সকাল ১০টার দিকে আগুন সম্পূর্ণভাবে নির্বাপণ করা হয়। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া ১৩ জনকে কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।নিহত ৬জনের মধ্যে ধোঁয়ায় শ্বাসবন্ধ হয়ে মারা গেছে।

প্রত্যদর্শীর বনর্না :এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফেরেন একই ভবনের চতুর্থ তলায় স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাসকারী শিবলু।অগুনের ঘটনার সময় ঘুমাচ্ছিলেন তিনি। তিনি জানান, হঠাৎ ওপরতলায় বৃষ্টির মতন গ্লাস ভেঙে পরার শব্দে ঘুম ভাঙে তার। পরিবার নিয়ে নিরাপদে বের হওয়ার চেষ্টা করলে আটকে পড়েন তিনি।

এরপর ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় সপরিবারে নিরাপদে ভবন থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি বলেন, যখন আগুনের ঘটনা ঘটে তখন আমরা ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ করে ওপর থেকে গ্লাস ভেঙে পড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। আগুন যে লেগেছে এটা বুঝতে পারেনি।

শব্দ পাচ্ছি ওপর তলায় গ্লাসের মতো কি যেন ভেঙে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে ফ্লোরজুড়ে বৃষ্টির মতো পড়ছে। তখনই আমার ঘুম ভেঙে যায়। সবাইকে নিয়ে দৌড়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করি। ধোঁয়া দেখে দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে নিরাপদে থাকার চেষ্টা করি। পরে একটা নির্দিষ্ট সময় পরে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতায় আমরা নিরাপদে বের হয়।

ছাদে ওঠার চেষ্টা,গেটে ছিল তালা :আবাসিক ভবনটির দোতলার বাসিন্দা এপিক গ্রুপের মার্চেন্ডাইজার জাহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, সকাল সোয়া ৭টার দিকে কাঁচ ভাঙার আওয়াজ পাই। দরজা খুলে দেখি সামনে ধোঁয়ায় ভরে গেছে। এরপর বুঝতে পারি সামনের ফ্ল্যাটে আগুন লেগেছে। তখন আমি দুই সন্তান, স্ত্রী ও শাশুড়িকে নিয়ে নিচে নেমে যাই।

তিনি জানান, দোতলার একাংশ ও তিনতলা মিলে ডুপ্লেক্স। সেখানে কাঠের সিড়ি আছে। এ কারণে দোতলায় লাগা আগুন সহজেই তিন তলা পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ডুপ্লেক্সে ভবন মালিক জুয়েল মোল্লা থাকেন। তিনি সকালে আগুন লাগার আগেই বিক্রমপুরের উদ্দেশ্যে রওনা হন।মৃতদের মধ্যে পাঁচতলার ভাড়াটে ফল ব্যবসায়ী হারিছ হোসাইন (৫২) তার ছেলে মো. রাহাব (১৬) ও ভাতিজি রোদেলা (১৪) ছাদে ওঠার চেষ্টা করে সিড়িতে আটকে পড়েন। গেটে তালা ছিল।

নিহতরা হলেন :ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), কুমিল্লার কোতোয়ালী থানার নানুয়াদিঘি পশ্চিমপাড়ার কাজীবাড়ির বাসিন্দা কাজী খোরশেদুল আলমের ছেলে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে মারা যান। আফরোজা আক্তার, নিহত ফজলে রাব্বি রিজভীর স্ত্রী। তার বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর থানার সিকারকান্দি গ্রামে। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।কাজী ফাইয়াজরিশান (আড়াই বছর), ফজলে রাব্বি রিজভী ও আফরোজা আক্তার দম্পতির আড়াই বছর বয়সী শিশু সন্তান। সে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

মো. হারিছ হোসাইন (৫২), ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ থানার দড়িপাচাশি গ্রামের হাফিজ উদ্দিনের ছেলে। তিনিও উত্তরার একই বাসায় (সেক্টর ১১, রোড ১৮) বসবাস করতেন। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মো. রাহাব (১৬), ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার নিহত হারিছ উদ্দিনের ছেলে। সেও উত্তরার ওই একই ঠিকানায় বসবাস করত এবং কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে মারা যায়। হারিছ হোসাইনের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪),
লুবানা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে তার মৃত্যু। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের দড়িপচাশী এলাকার শহিদুল ইসলামের মেয়ে।

জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন শাওন বিন রহমান জানান, আফরোজাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে তার শরীরে কোনো পোড়া ক্ষত নেই। ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মৃত্যুর সংবাদ জানার সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরা মরদেহ আবার উত্তরায় নিয়ে চলে যান।

নানির বাসায় থাকতো শিশু রিশান :নিহত আফরোজার মামাতো ভাই মো. আবু সাইদ জানান, ফজলে রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়া দিঘিরপাড়।তিনি ওষুধ প্রস্তুতকারক এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। আর তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ। তাদের দুই ছেলে রিশান ও রাফসান।

তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় তাদের দুই ছেলেই উত্তরাতেই নানির বাসায় থাকত। শুক্রবার অফিস বন্ধের দিন হওয়ায় গতরাতেই তারা ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে নিয়ে আসে। এরপর সকালে ওই বাসায় আগুনের সংবাদ পান স্বজনরা। পরে হাসপাতালে তাদের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।

ধারনা রান্না ঘর থেকে সূত্রপাত : উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ জানান, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করছি। গ্যাস সংযোগ অথবা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত। ফায়ার সার্ভিসের তদন্তে পরবর্তীতে জানা যাবে।

জিগাতলায় আবাসিক ভবনে আগুন :রাজধানীর জিগাতলায় একটি আবাসিক ভবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ২টি ইউনিট।গতকালশুক্রবার বেলা ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।

ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ইন্সপেক্টর আনোয়ারুল ইসলাম জানান, জিগাতলার বেরিবাধ এলাকার ৪তলা আবাসিক ভবনের তৃতীয় তলায় আগুন লাগে। বেলা ২টা ৩৬ মিনিটে তারা অগ্নিকান্ডের এ তথ্য পান তারা। ঘটনাস্থলে পৌছে ২টি ইউনিট ১০ মিনিটের মধ্যে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কোন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কীভাবে আগুন লেগেছে তা জানাতে পারেননি ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

সর্বাধিক পঠিত

Recent Comments