দেশে ১৪ দিনের ডিজেল, ২৮ দিনের অকটেন এবং ১৫ দিনের পেট্রোল মজুত রয়েছে

ইরানে ইসরাইলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবস্থার প্রেক্ষাপটে কাতারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ এশিয়ার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর।

ফলে দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে চলতি মার্চে জ্বালানি নিয়ে দুশ্চিন্তা না থাকলেও যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সংস্থান করা ব্যয়বহুল ও কঠিন হবে।

জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, কাতারে এলএনজি উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং বিকল্প উৎস থেকে সরবরাহ নিশ্চিত করা যায় কিনা তার ওপর নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে। তবে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।

ইরানের ড্রোন হামলার পর কাতারের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি কাতার এনার্জি এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। একই সময়ে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকো সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের বৃহত্তম শোধনাগার রাস তানুরা রিফাইনারি বন্ধ রাখে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচল বন্ধ বা সীমিত রয়েছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভর। দেশের জ্বালানি তেলের প্রায় শতভাগই আমদানি করা হয়। অপরিশোধিত তেল পুরোপুরি আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। আর পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় কয়েকটি দেশ থেকে। মোট গ্যাস চাহিদার প্রায় ৩৫ শতাংশ পূরণ হয় আমদানি করা এলএনজি দিয়ে, যার বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। গতকাল মঙ্গলবার সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬৬২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে এলএনজি থেকে এসেছে ৯৫২ মিলিয়ন ঘনফুট; বাকিটা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত। বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় সামনে এলএনজি সরবরাহ ১ হাজার ৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমদানি ব্যাহত হলে তা সম্ভব নাও হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে লোডশেডিং বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কমে শিল্প, পরিবহন ও আবাসিক খাতে ভোগান্তি বাড়তে পারে।

পেট্রোবাংলা জানায়, চলতি বছরে মোট ১১৫টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে ৪০টি এবং ওমান থেকে ১৬টি কার্গো আসার কথা। বাকি ৫৯টি কার্গো স্পট মার্কেট থেকে কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মার্চ মাসে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে ১১টি কার্গো আসার কথা, যার ৯টি ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।

তবে নতুন জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে। এতে দৈনিক প্রায় ২০০-২২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কমে যেতে পারে। বর্তমানে গড়ে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হলেও তা ৭০০ মিলিয়নে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাস ঘাটতি দেখা দিলে শিল্পখাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে সরবরাহ দেওয়া হতে পারে; আবাসিক ও পরিবহন খাতে সমন্বয় করা হতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সরবরাহে সংকট তৈরি হলে সরকার স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনার বিকল্প বিবেচনা করছে। তবে স্পট মার্কেটে দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে, যা ভর্তুকির চাপ বাড়াবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশও তার বাইরে থাকবে না। তবে চলতি মার্চ মাসে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি হবে না বলে আশা করি।

জ্বালানি মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধটা দীর্ঘমেয়াদি হলে অবশ্যই আমাদের জন্য সমস্যা হবে। শুধু বাংলাদেশ নয়, যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে বিশ্বের সব দেশই সংকটে ফেঁসে যাবে। যুদ্ধকালীন কিছু সমস্যা তো থাকেই, তবে আমাদের পক্ষ থেকে যতখানি চেষ্টা করা দরকার, তার সবটুকুই আমরা করছি এবং করব।

জ্বালানি বিভাগের সচিব মো. সাইফুল ইসলাম জানান, পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে আপাতত সমস্যা নেই। তবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হলে চাপ তৈরি হতে পারে। অপরিশোধিত ব্রেন্ট অয়েলের দাম ইতোমধ্যে বেড়েছে; আরও বাড়লে ভর্তুকি ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে। তিনি জানান, চীনভিত্তিক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ছয় মাসের চুক্তির আওতায় মার্চ-এপ্রিলের চালান নিয়ে প্রাথমিক নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। তবে এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বেশি।

জ্বালানি তেলের মজুত পরিস্থিতি
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান জানান, দেশে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে। বর্তমান মজুত দিয়ে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস অয়েল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিন চলবে।

সমুদ্রপথে ও খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে আরও প্রায় ২০ দিনের সরবরাহ। জানুয়ারি-জুন সময়ে ২৮ লাখ ২০ হাজার টন তেল আমদানির অনুমোদন রয়েছে, যার বড় অংশ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, চীন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা হবে। এ ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা নেই।

বিপিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন ঘটলে প্রভাব পড়তে পারে। বিকল্প হিসেবে ফুজাইরাহ টার্মিনাল ব্যবহারের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।

এলপিজি বাজারেও শঙ্কা
এদিকে এলপিজি খাত প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে সরবরাহ কমার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও সম্প্রতি বিপিসিকেও এলপিজি আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ১ লাখ ৯৮ হাজার টন এলপিজি দেশে এসেছে বলে জানা গেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments