শুক্রবারের ছুটির বিকাল। রাত ৮টায় হঠাৎ বৃষ্টিতে যেন শেষ শুক্রবারের অপেক্ষায় থাকা প্রকাশকদের স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে বসন্তের অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি। মেলার মাঠ জুড়ে জল জমে থইথই করছে। বৃষ্টির হানা যেন প্রকাশকদের দহনকে বাড়িয়ে দিল। এ যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। হঠাৎ শিলাবৃষ্টিতে বেশির ভাগ প্রকাশনীরই বই ভিজে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্টলের অবকাঠামো।
শুরুর দিকে বৃষ্টির তীব্রতা থাকলেও রাত ৯টার দিকে কমে আসে। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, এ সময়ের মধ্যে অর্থাৎ আড়াই ঘণ্টায় ১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। অথচ এদিন বইপ্রেমীদের আনাগোনায় মেলা অনেকটা চিরচেনা ছন্দে ফিরি ফিরি করছিল…। কিন্তু কার্যত ফিরলই না।
বিকালে মেলা প্রাঙ্গণে অন্য প্রকাশের স্টলে ‘শুধু মাধবীর জন্য’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয় লেখক ও আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের। এ সময় অন্যপ্রকাশের স্টলে বইপ্রেমী এবং দলের শুভার্থীদের ভিড় জমে যায় এবং তার অটোগ্রাফ নিতে দেখা যায় অনেককে।
এ সময় কথা হলো লেখক আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের সঙ্গে। সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা কিংবা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা কতটুকু সম্ভব ইত্তেফাকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সাহিত্য হচ্ছে সমাজের দর্পণ এবং সেই প্রেক্ষাপটে যদি সমাজের দর্পণটাকে তুলে ধরা সম্ভব হয় সাহিত্যের মাধ্যমে, এটা হলো ডায়গোনোসিস। যদি প্রপার ডায়গোনোসিস করা যেতে পারে, তা যদি সুসাহিত্যের মাধ্যমেই প্রপার ডায়গোনোসিস হয়, তাহলে এর সমাধান বের করা সম্ভব হয়।
লেখালেখি তো ২২ জনের ফুটবল খেলা নয়, কোরাস কণ্ঠের গান নয়, নাটক নয় আপনার কী মনে হয়? এমন আরেক প্রশ্নের জবাবে এই লেখক বলেন, লেখালেখি প্রত্যেকটা লেখকের মনের খোরাক। সে সমাজকে যে দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখে, যেভাবে দেখে সেটা সে তুলে ধরে। সেটাই যখন অনেকের দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে প্রতিফলিত হয় সেটাই লেখালেখি। পাঠকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যে কোনো ধরনের বই পড়ুন। যে কোনো ধরনের বইই জ্ঞান আহরণের অন্যতম উৎস।
সময় প্রকাশনীর স্টলে দেখা গেল খবরের কাগজের সম্পাদক ও কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামালকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজই (শুক্রবার) একটু ভালো লাগছে সমাগম দেখে। বইমেলা তো প্রাণের মেলা। লেখক-প্রকাশকের সম্মিলন ঘটে এখানে। তবে এবার ছন্দপতন হয়েছে বইমেলার। এজন্য মন খারাপ তো হয়েছেই। কারণ পাঠকরাই এই মেলাটাকে মাতিয়ে রাখেন। আমরা আশা করব, আগামীতে ফেব্রুয়ারিতেই মেলা হবে এবং আগের মতোই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে। এই লেখক বলেন, মেধাবিকাশের জন্য সৃজনশীল বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
অনুপম প্রকাশনীর স্টলে কথা হলো বিজ্ঞান লেখক ফারসীম মান্নান মোহাম্মদীর সঙ্গে। তিনি বললেন, আজ শুক্রবার জনসমাগম দেখে ভালো লাগছে। বই পড়ুয়াদের জন্য এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক পুরোনো বইও এই মেলায় পাওয়া যায়। এটা অন্যরকম ভালো লাগা। কিন্তু প্রকাশকদের মন ভালো নেই।
এই মেলায় বই বিক্রি হচ্ছে এক-নবমাংশ। পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি-মেলামুখো যদি না-ও হতে পারেন অনলাইনে অনেক বই পাওয়া যায়। যে করেই হোক বই পড়তে হবে। আমাদের সমাজে একটা বড় ধরনের গ্যাপ তৈরি হয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা নাজুক হয়ে গেছে। এটাকে ওভারকাম করতে হলে বই পড়তে হবে।
কথা হলো লেখক ফারহানা মান্নানের সঙ্গে। তিনিও বললেন, বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা যে গোছানো মেলা দেখে আসছিলাম। এবার তো সেই গোছানো ব্যাপারটা নেই। শেষ পর্যন্ত মেলা হয়েছে এটা বড়ো বিষয়। তবে প্রকাশকরা বললেন অন্য কথা। শুক্রবারে সমাগম বাড়লেও বিক্রি বাড়েনি। বিশেষ করে বড় স্টলগুলোতে কিছুটা বিক্রি হলেও ছোট স্টলগুলো মার খেয়েছে বেশি।
জানতে চাইলে সাহিত্যমালার দেবাশীষ দাস বলেন, বেলা ১১টায় স্টল খুলেছি, প্রথম বিক্রি হয়েছে দুপুর ১টায়। সন্ধ্যা অবধি তিনটি বই বিক্রি হয়েছে। ইউপিএলের প্রধান নির্বাহী মাহরুখ মহিউদ্দীন আক্ষেপ করে বলেন, কোনো প্রত্যাশা নিয়ে মেলায় আসিনি। করোনাকালীন যে অভিজ্ঞতা, তার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি এবারের বাস্তবতা। তিনি বলেন, প্রত্যাশার বাইরে চোখ রাখছি ঘটনাগুলোয়।
শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার পুরস্কার প্রদান
সকাল সাড়ে ১০টায় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলা একাডেমির সচিব ড. মো. সেলিম রেজা। প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ।
সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা: ক-শাখায় প্রথম হয়েছেন মো. আফ্ফান আল হাসনাইন, দ্বিতীয় হয়েছেন আনহিতা রেদোয়ান আভা, তৃতীয় হয়েছেন মো. রিসালাত শাহ। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন চারুলতা রহমান জারা, ২য় হয়েছেন বায়ান রাশদান, ৩য় হয়েছেন দ্যুলোক দ্যুতিমান। গ-শাখায় ১ম হয়েছেন শ্রেয়া রায়, ২য় হয়েছেন স্বস্তি চৌধুরী, ৩য় হয়েছেন আদিত্য সাহা।
শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় ক-শাখায় ১ম হয়েছেন পূর্ণতা আদিত্য, ২য় হয়েছেন সাহানা ইসলাম সাইফা এবং ৩য় হয়েছেন আরওয়া রহমান তাজরি। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন বেহজারিন হাসান তারফি এবং ৩য় হয়েছেন কারিমা হোসাইন দিয়া এবং গ-শাখায় ১ম হয়েছেন সিমরিন শাহীন রুপকথা, ২য় হয়েছেন রাজ্যশ্রী সাহা এবং ৩য় হয়েছেন সমৃদ্ধি সূচনা স্বর্গ।
শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা: ক-শাখায় ১ম হয়েছেন শ্রীজা মণ্ডল, ২য় হয়েছেন মাগফিরাহ মাবরুরা তৈষী এবং ৩য় হয়েছেন হিয়াঞ্জলি তরফদার। খ-শাখায় ১ম হয়েছেন তাসবিহা আয়ান তানহা, ২য় হয়েছেন সার্থক সাহা এবং ৩য় হয়েছেন বিদ্যাস্তুতি সিংহ। গ-শাখায় ১ম হয়েছেন রোদসী নূর সিদ্দিকী, ২য় হয়েছেন তানজিম বিন তাজ প্রত্যয় এবং ৩য় হয়েছেন নাবিলা আক্তার রায়না।
মূল মঞ্চ
বেলা ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ: বদরুদ্দীন উমর’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফিরোজ আহমেদ। আলোচনায় অংশ নেন সুমন রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। আলোচনা-পরবর্তী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)।
এতে কবিতা আবৃত্তি করেন এ বি এম সোহেল রশিদ, মিজানুর রহমান, এনামুল হক জুয়েল। সংগীত পরিবেশন করেন আলম আরা মিনু, হাসান চৌধুরী, জাকির হোসেন আখের, পিয়াল হাসান, ফরহাদ হোসেন নিয়ন, অধ্যক্ষ আশরাফ শাহিন, মনির হোসেন, হাবিবুর রহমান রেখা সুফিয়ানা, মৌসুমী ইকবাল, জ্যোৎস্না, মিতা মল্লিক, রাফিজা আলম লাকি এবং নাতে রাসুল পরিবেশন করেন শাহিনুর আবেদিন।
এদিন মোড়ক উন্মোচন করা হয় এম এম বাদশাহর ‘গোপন স্বপ্নের খোঁজে’ মেলায় এসেছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহর কিশোর উপন্যাস ‘গোপন স্বপ্নের খোঁজে’। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন সাহিত্যিক পলাশ মাহাবুব এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব কাজী সায়েমুজ্জামান। এছাড়া ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সদস্য লেখক শান্তা ফারজানার বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচিত ‘নেইল পলিশ’ গল্পগ্রন্থের পাঠ উন্মোচন হয়েছে।
নতুন বই
গতকাল শুক্রবার ১৬তম দিনে মেলায় নতুন বই এসেছে ২৭৭টি। আর গত ১৬ দিনে মেলায় এ পর্যন্ত মোট বই বেরিয়েছে ১ হাজার ৬০০টি। এর মধ্যে স্টুডেন্ট ওয়েজ এনেছে রফিক আজাদের ‘কবিতা ভাবনা ও অন্যান্য’, আগামী প্রকাশনী এনেছে ‘তাঁদের স্মৃতি ও সৃষ্টি’, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অন্যপ্রকাশ এনেছে মো. আসাদুজ্জামানের ‘শুধু মাধবীর জন্য’, ঐতিহ্য এনেছে হরিপদ দত্তের ‘নরমুণ্ড’, বাতিঘর এনেছে মোহিত কামালের ‘চার মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস’, উষার দুয়ার এনেছে সিগমা আউয়ালের ‘ভালোবাসার গহীন জলে’, বর্ষাদুপুর এনেছে ‘গোপন স্বপ্নের খোঁজে’, সাউন্ডবাংলা এনেছে ‘নেইল পলিশ’ উল্লেখযোগ্য।



