পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার, সংসদে প্রথমবার প্রশ্নোত্তরে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির তথ্য অনুযায়ী ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে অবৈধ অর্থপ্রবাহের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা প্রতিবছরে গড়ে ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা)।

সার্বিকভাবে বর্তমান সরকার দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং এবং আর্থিক অপরাধ দমনের বৃহত্তর কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।

গতকাল বুধবার সংসদ অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রথমবারের মতো দেওয়া প্রশ্নোত্তরে পৃথক দুটি সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান তার সরকারের এই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের কথা জানান। সংসদে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

‘অতীতে দেখা গেছে- সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি যাকে খুশি উঠিয়ে নিয়ে গেছে, জোর করে কিছু লিখে নিয়েছে’
বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান।

জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতদের তালিকার দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নয়। এর জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ আছে। তারা এটি করছে। বর্তমান সরকার একটি নির্বাচিত সত্ত্বা। অতীতে দেখা গেছে, সরকারের বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের ইচ্ছা, আগ্রহের কারণে দেশের আইনকানুন, নীতিনৈতিকতার তোয়াক্কা না করে, যাকে যেরকম হয়েছে, উঠিয়ে নিয়ে গেছে। যার কাছ থেকে যেরকম মনে হয়েছে, জোর করে কিছু লিখে নিয়ে গেছে।

সংসদ নেতা বলেন, বর্তমান সরকার আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং প্রচলিত আইন মেনে কাজ করতে চায়। যাতে কোনো মানুষ ন্যায্য আইন থেকে বঞ্চিত না হয়। সেকারণে সরকার আইনগতভাবেই সব প্রক্রিয়া গ্রহণ করবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাবে। যারা দেশের ও জনগণের অর্থ পাচার করেছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তি হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, এক কথায় যদি বলতে হয় এটি (পাচার হওয়া অর্থ) জনগণের অর্থ। যেহেতু আমরা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সত্তা, জনগণের প্রতি এবং দেশের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আছে; খুব স্বাভাবিকভাবেই জনগণের অর্থ ফিরিয়ে এনে দেশ ও জনগণের জন্য ব্যয় করা এই সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কাজেই এব্যাপারে যেভাবেই হোক, যে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে জনগণের অর্থ ফেরত আসবে, এই সরকার সেই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

১১ মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান, এরমধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার পরিবারসহ ১১ ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান। প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স কর্তৃক চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলায় পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলমান। এর মধ্যে রয়েছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, ডা. এইচ বি এম ইকবাল, সামিট গ্রুপসহ এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিবারের সদস্য ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান।

অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারে রয়েছে
সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী আমলে সংঘটিত অর্থ পাচার ও দুর্নীতির অনুসন্ধান করে একটি পূর্ণাঙ্গ শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং এতের চিহ্নিত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, পাচারকৃত অর্থ একাধিক দেশে স্থানান্তরিত হওয়ার অভিযোগ থাকায় তা উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, সম্পদ শনাক্তকরণ এবং পারস্পরিক আইনগত সহায়তা জোরদার করা হচ্ছে। এলক্ষ্যে ‘পারস্পরিক আইনগত সহায়তা চুক্তি’ (এমএএলটি) সম্পাদন ও বিনিময় প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।

১০ দেশে খোঁজা হচ্ছে পাচার হওয়া অর্থ, তিনটি দেশ চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত
প্রধানমন্ত্রী জানান, অর্থ পাচারের গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১০টি দেশ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও হংকং-চায়না। এরমধ্যে মালয়েশিয়া, হংকং ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। অপর ৭টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি মামলার অগ্রগতি সংসদে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল, শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সমন্বয়ে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান ও তদন্ত দল গঠন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালত গত ২৫ মার্চ পর্যন্ত ৭০ হাজার ৪৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক (সংযুক্ত) ও অবরুদ্ধ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশে ৫৭ হাজার ১৬৮ কোটি ৯ লাখ টাকার এবং বিদেশে ১৩ হাজার ২৭৮ কোটি ১৩ লাখ টাকার সম্পদ। পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ১৪১টি মামলা করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫টি মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে এবং ৬টি মামলার রায় হয়েছে।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য এ বি এম মোশাররফ হোসেনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, গত ১০ মার্চ দেশের ১৩টি জেলার ৩টি করপোরেশন/ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে ৩৭ হাজার ৮১৪টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা প্রদান করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাকি তিন মাসে আরো ৩০ হাজার পরিবারকে এ কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। আগামী চার বছরের মধ্যে ৪ কোটি পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনা হবে।

যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রাখবো
তারেক রহমান আরো বলেন, বর্তমান সরকার দেশের মানুষকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে প্রাথমিক কাজ শুরু করা হয়েছে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে সারাদেশে পর্যায়ক্রমে সকল কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে পালনের চেষ্টা অব্যাহত রাখবো।

ফ্যামিলি কার্ড পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে দেওয়ার কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে একদিকে যেমন এই সহায়তা সরাসরি পরিবারের সদস্যদের খাদ্য, পুষ্টি, জরুরি চিকিৎসা ও শিক্ষায় ব্যয় হবে, অন্যদিকে ফ্যামিলি কার্ডটি পরিবারে নারীপ্রধানের নামে হওয়ায় পরিবারের সম্পদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। পরিবার ও সমাজের ওপর নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবে।

সরকার টাকা ছাপিয়ে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ‘কৃষক কার্ড’ সহায়তা দিচ্ছে না,
কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না, বরং এতে অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আখতার হোসেন সম্পূরক প্রশ্নে বলেন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ যেসব কার্ড দেওয়া হচ্ছে, তার ইতিবাচক দিক রয়েছে। এতে কত খরচ হবে। এটা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সেক্ষেত্রে সরকারের পরিকল্পনা কী হবে?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ খাতে কত বাজেট, তা এখনই তিনি বলছেন না। পর্যায়ক্রমিকভাবে এগুলো এগিয়ে নেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে প্রতি মাসে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হবে। প্রতিবছরই বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার টাকা ছাপিয়ে এ সহায়তা দিচ্ছে না। কাজেই মূল্যস্ফীতি হবে না বরং এই টাকা যাদের দেওয়া হবে, সেই সব কৃষক ও নারী নিশ্চয়ই সিঙ্গাপুর বা বিভিন্ন দেশে পাচার করবেন না। এই টাকা স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যয় হবে। এতে অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, প্রান্তিক গোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments