আগের পোশাকেই ফিরছে পুলিশ, প্যান্ট হচ্ছে খাকি

পুলিশের পোশাক পরিবর্তন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সে ক্ষেত্রে মহানগর ও সারাদেশের পুলিশের আগের যে পোশাক ছিল সেখানে শার্টের রং একই থাকবে। তবে সবার প্যান্ট হবে খাকি রঙের। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।

এক সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর পোশাকের রং খাকি হওয়ার কারণে এই উপমহাদেশে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাকের প্রতিশব্দ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই ‘খাকি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ২২ বছর পর পুলিশের পোশাকে আবারও ফিরবে ‘খাকি’।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারাদেশে বিদ্যমান যে পুলিশের পোশাক আছে সেটা নিয়ে কেউ সন্তুষ্ট না। যেটা দৃশ্যমান, এই পোশাকটা আসলে মানানসই না। সেজন্য পুলিশ বাহিনীর আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টা বিবেচনা করেছি। একটা ঐতিহ্যবাহী ড্রেস দেওয়া যায়, তারও একটা অংশ বিবেচনা করেছি। আগের যে শার্ট মেট্রোর জন্য এবং সারাদেশের জন্য ছিল, সেটা বহাল রেখেছি। তবে প্যান্ট খাকি করা হচ্ছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই পোশাক পেতে পুলিশের কিছু সময় লাগবে। প্রস্তুতির বিষয়ে আছে। এই পোশাক পেলে মহানগর পুলিশকে দেখা যাবে আগের মতই হালকা জলপাই বা লাইট অলিভ রঙের শার্টে। সঙ্গে থাকবে খাকি প্যান্টে। আর জেলা পুলিশসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা গাঢ় নীল শার্টের সঙ্গে খাকি প্যান্ট পরবেন।

বিগত বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় সরকারের আমলে ২০০৪ সালে পুলিশের খাকি পোশাকে পরিবর্তন আসে। সেই সময় মহানগর পুলিশের ইউনিফরমে ছিল গাঢ় নীল শার্টের সঙ্গে খাকি প্যান্ট। অন্য পুলিশ ইউনিটের সদস্যরা খাকি শার্ট ও খাকি প্যান্টের ইউনিফরম পরতেন।

২০০৪ সালে সেই পোশাক পরিবর্তন করে মহানগর পুলিশের সদস্যদের জন্য হালকা জলপাই শার্টের সঙ্গে ডার্ক ব্লু প্যান্ট প্রবর্তন করা হয়েছিল। আর অন্য সব ইউনিটের পুলিশদের ডিপ গ্রে শার্টের সঙ্গে ডার্ক ব্লু প্যান্ট পরতে হত।

প্রায় ২১ বছর পর গত বছরের নভেম্বরে পুলিশের ওই পোশাকে পরিবর্তন আনা হয়। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করতে না করতেই সেই পোশাক পরিবর্তনের দাবি ওঠে পুলিশের মধ্য থেকেই।

এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের পেছনে এর মধ্যেই ৭৬ কোটি টাকা খরচ হয়ে গেছে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থায় নতুন পোশাকের পেছনে খরচ কতটা যুক্তিযুক্ত তা নিয়েও আলোচনা আছে।

প্রসঙ্গ জঙ্গি : বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের সমন্বয়, ব্যবস্থাপনা ও আইনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত জাতীয় কমিটির প্রথম সভা শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জঙ্গি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্যে অমিল রয়েছে।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ‘আমি কে’ বলে তিনি প্রশ্নদাতার দিকে তাকিয়ে উত্তর জানতে চান। আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে জবাব দেওয়ার পর সালাহউদ্দিন বলেন, আমি যেটা বক্তব্য দিয়েছি, ওটাই তো আপনারা ছাপিয়েছেন। তথ্য উপদেষ্টা কীভাবে বলেছেন জানি না। হয়তো আপনাদের লেখার মধ্যেও ‘মিসইন্টারপ্রেট’ হয়ে যেতে পারে। এটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কী বলেছে সেটা শুনতে হবে।

পুলিশে রদবদল ও বাধ্যতামূলক অবসর : সম্প্রতি পুলিশে বেশ কিছু রদবদল এবং বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের রুটিন ফাংশন যেগুলো নিয়োগ, বদলি, প্রমোশন, রিটায়ারমেন্ট এগুলো সবই আইনানুগভাবে করা হয়েছে আইনানুগ প্রক্রিয়া। এটা নতুন কোন বিষয় না। পদ সৃজনের প্রয়োজন হলে মন্ত্রণালয় পদ সৃজন করতে পারে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে। সেখানে যখন যেটা প্রয়োজন সেটা আমরা করি।

যাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল কিনা? জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এগুলো ডিপার্টমেন্ট যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেয়। এই বাছাই কীভাবে হয়, জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, এটা মন্ত্রণালয়ের আভ্যন্তরীণ বিষয়। এগুলোর জন্য কমিটি আছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, অভিযোগ তো অনেকের বিরুদ্ধেই আছে, এগুলো যাচাই-বাছাই করা হয়। যাতে ‘ইনজাস্টিস’ না হয় সেভাবে দেখা হয়। বিধি মোতাবেক দেখা হয়।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অপরাধীদের জামিন : খুন, ছিনতাই ও অপরাধীদের জামিনে পাওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ৫ আগস্টের পরে অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী এবং অনেক দাগি আসামি কারাগার থেকে বেরিয়ে এসেছে, আমরা তা লক্ষ্য করেছি। তারা জামিনে বেরিয়েছে, এটা আদালতের বিষয়। এটা আমাদের বিষয় নয়। তারা স্বভাবগত অপরাধী বলে অনেকেই চিহ্নিত। তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে, অপরাধ করবে এটা স্বাভাবিকভাবেই আমরা ধারণা করতে পারি। কিন্তু পুলিশ কোনো ‘অ্যাকশন’ করতে গেলে সে ব্যাপারে আমাদেরকে আইনানুগভাবে যেতে হয়। থানায় মামলা থাকলে সেটা তদন্ত করে যেতে হয়।

‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ খন্দকার নাইম আহমেদ টিটন হত্যার বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এগুলোর বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করে দেখছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী হোক আর যাই হোক হত্যাকাণ্ড মানেই হত্যাকাণ্ড। সেটা আইনের আওতায় আসবে। এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এটা ব্যতিক্রম হিসাবে দেখার কোনো কারণ নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মানুষের আশানুরূপ বা স্বাভাবিক ছিল না তুলে ধরে সালাহউদ্দিন বলেন, যেহেতু দীর্ঘদিন যাবত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছিল, যেহেতু তারা নির্বাচিত সরকার ছিলে না, সেই ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগের কর্মকাণ্ড তারা সেভাবে হয়তো যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারেনি। হয়তো নিয়ন্ত্রণ সেভাবে ছিল না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনশৃঙ্খলার এমন পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। এখন গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের স্বস্তির জন্য আইনশৃঙ্খলাকে একটা পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বৈঠকের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সারা দেশের মতো পরিস্থিতি টেকনাফ, কক্সবাজার, উখিয়াতে নয়। সেখানে কিছু ব্যতিক্রমধর্মী বিষয় আছে। প্রায় ১২ থেকে ১৪ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী সেখানে আছে। তাদের ক্ষেত্রে বিস্তারিত ম্যানেজমেন্ট, ক্যাম্পের ভিতর শৃঙ্খলা রাখা, মাদকদ্রব্য, চোরা কারবারির বিষয়গুলো আছে। সে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি যাতে সুন্দর ভাবে কাজ করতে পারি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেখানে যৌথ অভিযান কীভাবে হবে সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মাদকের বিষয় সর্বত্র বিশেষ অভিযান হবে। একজন সাংবাদিককে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখি।

অন্যতম সফল সংসদ : দীর্ঘ ১৭ বছর পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনকে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম সফল ও প্রাণবন্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে প্রথম অধিবেশনকে ব্যর্থ দাবি করার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংসদের প্রথম অধিবেশনই ছিল বেশ ‘লাইভলি’ ও ‘ভাইব্রেন্ট’, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, এ সংসদে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আইন প্রণয়ন হয়েছে। যদিও বিতর্কের সংখ্যা সর্বাধিক না হলেও, আলোচনা হয়েছে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে। সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় ছিল।

মন্ত্রী আরও বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে সরকারি ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করেছে। যৌথভাবে কমিটি গঠন এবং ঐক্যবদ্ধভাবে মতামত প্রদানের বিষয়টি জনগণ প্রত্যক্ষ করেছে। গণতন্ত্রে মতবিরোধ ও ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। বিরোধী দল তাদের মতামত প্রকাশ করেছে, পাশাপাশি সরকারও তাদের অবস্থান তুলে ধরেছে। এ ধরনের বিতর্কই গণতন্ত্রের মূল শক্তি।

সব মিলিয়ে বর্তমান সংসদে মতবিনিময়, সহযোগিতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments