রসালো ফলের মৌতাতে উতলা এখন প্রকৃতি। চারদিক এখন পাকা ফলের সৌরভে মাতোয়ারা। সুবাসিত আবেশ। আজ শুরু মিষ্টি ফলের রসে টইটম্বুর মধুমাস। আজ পয়লা জ্যৈষ্ঠ। গাছে গাছে এখন পুরুষ্টু কাঁঠালের বর্ণাঢ্য বিভা। গাঢ় সবুজ আমের শরীরে সিঁদুরের ছোপ। পেকে ওঠা লিচুগাছ ঘিরে দিনে পাখি আর রাতে বাদুড়ের কোলাহল।
পাকা জামের মধুর রসে মুখ রঙিন করার স্বপ্নের দোলা। জাম-জামরুল-লিচু, আনারস, করমচা, আতা, তরমুজ, ফুটি, বাঙ্গি, বেল, খেজুর, কাঁচা তাল, জাম্বুরা, কাউফল, গোলাপজাম, কামরাঙা, লটকনসহ হরেক ফলের স্বাদ আর রঙের ছোঁয়ায় বাঙালির রসনা তৃপ্তির মৌসুম। বাহারি আর পুষ্টিকর সব ফলের প্রাচুর্য এই মৌসুমকে দিয়েছে মধুমাসের মহিমা।
বাঙালির মধুমাস জ্যৈষ্ঠ আসার আগেই রস টসটস বর্ণিল রঙের ফলে ছেয়ে গেছে বাজারগুলো। গ্রামের হাটবাজারে এখন মিষ্টি ফলের সুবাস। গ্রামের মতো শহরে ফলের দোকান সাজিয়ে বসেছেন। দূর-দূরান্ত থেকে এরই মধ্যে রাজধানীতে আসতে শুরু করেছে মধুমাসের নানা জাতের ফল। ফলের ম ম ঘ্রাণে ভরে উঠেছে ফলের আড়তগুলো। কোথাও কোথাও মৌসুমি ফলের মেলা বসবে।
সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, নাটোর, ঈশ্বরদী থেকে গুটি আম, মোহনভোগ, গোপালভোগসহ বাহারি নামে বিভিন্ন আমে বাজার সয়লাব। ভারতীয় গুটি আম গোবিন্দভোগ, হিমসাগর পাওয়া যাচ্ছে বৈশাখের শুরু থেকেই। এ ছাড়া রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জের ল্যাংড়া, হিমসাগর, গোপালভোগ, লক্ষ্মণভোগ মধুমাসকে পরিপূর্ণ করবে।
আর এর পরই আসবে সে অঞ্চলের ফজলি আম। গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া, রানীভোগ, ফজলি, আশ্বিনা ছাড়াও এখন বাংলাদেশে নতুন জাতের আম ফলছে। যেমন-আম্রপালি, সোনালি, হাঁড়িভাঙ্গা, সূর্যপূরী, কাঁচামিঠা ইত্যাদি। কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল।
ছোট-বড় নানা ধরনের কাঁঠাল বিকিকিনি হতে দেখা যাবে বাজারে। কাঁঠাল এমন একটি ফল যা কাঁচা-পাকা দুটি অবস্থাতেই খাওয়া যায়। কাঁচা কাঁঠালকে এচোড় বলা হয়। একেকজনের পছন্দ একেক রকম। কেউ আম খেতে ভালোবাসে, কেউ আবার কাঁঠাল।
মধুমাস জ্যৈষ্ঠ নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য কবিতা-গান। তবে মধুমাস এলেই মনে পড়ে পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের সেই আলোড়িত পদ্যটি—‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে যাই/ফুলের মালা গলায় দিয়ে/মামার বাড়ি যাই/মামার বাড়ি ঝড়ের দিনে/আম কুড়াতে সুখ/পাকা জামের মধুর রসে/রঙিন করি মুখ।’
জৈষ্ঠের প্রথম দিনে আম ভাঙা শুরু হলো:
আমের মান ঠিক রাখতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তৈরি করেছে ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’; জেলাওয়ারি, জাতভিত্তিক আম সংগ্রহের সরকারি সময়সূচি।
দেশে সবার আগে আম পাড়া শুরু হয় সাতক্ষীরায়। ৫ মে থেকেই সেখানে গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, বৈশাখী ও বোম্বাই জাতের আম সংগ্রহ শুরু হয়েছে। রপ্তানিযোগ্য গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ পাড়া শুরু হয়েছে ১২ মে থেকে। হিমসাগর ও খিরসাপাত ২২ মে।
ল্যাংড়া ১০ জুন এবং আম্রপালি ১৫ জুন থেকে। সাতক্ষীরার আম আগে পাকার কারণ হল- জেলাটির ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ু। উপকূলীয় এলাকা হওয়াতে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার একটি বিশেষ সমন্বয় থাকে, যা আমকে আগেভাগেই পরিপক্ব করে তোলে। সাতক্ষীরার পরপরই আসে দক্ষিণ-পশ্চিমের অন্য জেলাগুলো। চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে রপ্তানিযোগ্য আম পাড়া শুরু হচ্ছে আজ ১৫ মে থেকে।
দুই জেলায়ই গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ১৫ মে। হিমসাগর ও খিরসাপাত ২৭ থেকে ২৮ মে। ল্যাংড়া ১০ জুন এবং আম্রপালি ২০ থেকে ২১ জুনের মধ্যে সংগ্রহ শুরু হবে। মেহেরপুরে শুরু একদিন পরে ১৬ মে থেকে। তবে এই জেলায় ফজলির মতো বিশেষ জাতও পাওয়া যাবে, যা সংগ্রহ শুরু হবে ২৩ জুন থেকে। কুষ্টিয়া জেলায় আম পাড়া শুরু হবে ২০ মে থেকে। গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ সেদিন থেকেই। হিমসাগর ২৯ মে, ল্যাংড়া ১১ জুন এবং ফজলি আসবে ২৪ জুনে।
আমের জন্য বিখ্যাত রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম পাড়া শুরু হয় একটু দেরিতে। তবে এই দুই জেলার আমের স্বাদ ও মানের কারণেই বাংলাদেশ আম রপ্তানিতে সুনাম অর্জন করেছে। রাজশাহীতে রপ্তানিযোগ্য আম পাড়া শুরু হবে ২৫ মে থেকে। গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ২৫ মে, হিমসাগর ৩০ মে, ল্যাংড়া ১২ জুন, লক্ষণভোগ ১৬ জুন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১৮ জুন, আম্রপালি ২৫ জুন, ফজলি ২৬ জুন এবং সবার শেষে গৌরমতি আসবে ৩১ জুলাই। চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু ২৬ মে থেকে।
এখানে সবচেয়ে বেশি জাতের আম পাওয়া যায়। গোপালভোগ ২৬ মে থেকে শুরু হয়ে হাড়িভাঙা আসবে ২০ জুন, ফজলি ৩০ জুন এবং গৌরমতি পাড়া শুরু হবে ৪ আগস্ট থেকে। নাটোরেও একই সময়সূচি ২৫ মে থেকে শুরু, গৌরমতি আসবে ৫ জুলাই। নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও— উত্তরের এই জেলাগুলোতে আম পাকে সবচেয়ে দেরিতে। তবে এখানকার আম, বিশেষ করে হাড়িভাঙা জাতটি, দেশজুড়ে সুখ্যাত।
নওগাঁয় আম পাড়া শুরু হবে ১ জুন থেকে, রংপুরে ৩০ মে, দিনাজপুরে ২ জুন এবং ঠাকুরগাঁওয়ে ৩ জুন থেকে। এই জেলাগুলোতে গৌরমতি পাড়া হবে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত—দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ে যথাক্রমে ১২ ও ১৪ অগাস্ট। অর্থাৎ মে থেকে শুরু হয়ে আম পাওয়া যাবে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। শুধু জানতে হবে কোন জেলায় কোন জাত কখন পাকে।
সময়ের আগে আম কিনলে যে ক্ষতি:
সরকারি ক্যালেন্ডার তৈরির পেছনে একটি বড় কারণ আছে। অপরিপক্ব অবস্থায় পাড়া আম স্বাদে হয় টক বা কম মিষ্টি, ঠিকমতো পাকেও না। অনেক সময় রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। একটু সচেতনতাই রক্ষা করবে ঠকে যাওয়া থেকে। আর পরিবারকে দিতে পারবেন আসল মিষ্টি, সুগন্ধি, পরিপক্ব আমের স্বাদ।



