রাজধানী মিরপুরের হযরত সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদীর (রহ:) মাজারে হামলার ঘটনায় শাহ আলী থানায় একটি মামলা হয়েছে। ঘটনার দিন হামলাকারীদের হামলায় আহত একজন নারী বাদী হয়ে শনিবার সকালে মামলা দায়ের করেন।
মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে এ ঘটনার সাথে ১০০ থেকে ১৫০ জন জামায়াত ইসলামীর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের সদস্যদের আসামী করা হয়েছে। মামলা দায়েরের পর পুলিশ গতকাল দুপুরে মাজার এলাকা থেকে হামলাকারী সন্দেহে দুই জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মোঃ রাসেল (৩৮) ও আরমান দেওয়ান (২৮)।
এদিকে জড়িতদের গ্রেফতার ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গতকাল দুপুরে মাজার এলাকায় মিছিল ও সমাবেশ করেছে। কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের নেতৃত্বে এনসিপির মিছিল ও সমাবেশের আগে একটি প্রতিনিধি দল মাজার পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি আক্রান্তদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বর্ণনা শোনেন। এরপর নেতারা শাহ আলী থানায় যান। ঘটনার দিন পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মামলা অনুযায়ি ২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
মামলায় যেসব অভিযোগ ঃ শাহ আলী থানায় রেসমি বেগম (৪০) নামে দিয়াবাড়ী এলাকার বাসিন্দা বাদী হয়ে মামলা করেন। মামলায় যে নয় জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তারা হলেন, আলী আকবর (৪৮), বাপ্পা (৩৫), বাবু (৪৫), কাউসার (২৬), আজম (৪০), শেখ মোঃ রাসেল (৩৮), কাজী জহির (৫২), মিজান (৩৮) ও কাজী পনির (৫০)। এই নয় জনসহ অজ্ঞাতনামা ১০০/১৫০ জন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের সদস্যগণ এই হামলায় জড়িত।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, বাদী ১৭ বছর ধরে শাহ্ আলী বাগদাদী (রহঃ) মাজার শরীফ জিয়ারত করে আসছেন। ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অনুমানিক ১২ টা ৫ মিনিটের দিকে মাজারের হাজার লোকের সমাগম হয়ে লাঠিসোটা নিয়ে আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়ে প্রধান গেট দিয়ে মাজারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।
তারা জিয়ারতকারী এবং মানতকারীদের উপর অতর্কিতভাবে হামলা করে। মাজারের সিন্নি গাছের গোড়ায় থাকা লাল কাপড় টানা হেচড়া করে ছিড়ে ফেলে ও মোমবাতি জ্বালানোর প্লেট ভাংচুর করে চরমভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। ওই সময় তিনি বাধা দিলে হামলাকারীরা তাকে এলোপাথারি মারপিট করে। তার পরনে পোষাক টেনে শ্লীলতাহানি ঘটায়। এসময় একজন তার মাথায় লাঠি দিয়ে আঘাত করলে মাথা ফেটে যায়। আসামীরা মাজারের মানতের খিচুরির পাতিল ছুঁড়ে মারে। মানতের সিন্নি নষ্ট করে।
এনসিপি’র সমাবেশ ঃ এনসিপির নেতৃবৃন্দ মাজার পরিদর্শন শেষে সেখানে একটি সমাবেশ করে। সমাবেশে এনসিপির যুগ্ন¥ আহবায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, আমরা গত দুই বছরে মাজার হামলার সুষ্ঠু তদন্তের উদ্দেশ্যে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানচ্ছি। তিনি বলেন, কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরসহ বিভিন্ন মাজারে হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট।
ফিলিপনগরের ঘটনায় সরকারি দলের নেতাদের জড়িত থাকার প্রমাণ থাকার পরও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট থাকার পরও তাদের আড়াল করতে মব শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা যাচ্ছে। এভাবে উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে সরকার দায় এড়াতে পারবে না।
সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতৃবৃন্দ ও কর্মী শাহ আলী থানায় যান। তারা ঘটনার দিন পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে। শাহ আলী থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলমের কাছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এনসিপি নেতৃবৃন্দ। এনসিপি নেতৃবৃন্দ এঘটনার দিন মাজারে কারা হামলা চালিয়েছে-সে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানায়।
পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় উদ্বেগ গণসংহতির: এদিকে শাহ আলী মাজারে হামলার ঘটনায় পুলিশের নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী (ভারপ্রাপ্ত) দেওয়ান আবদুর রশিদ নীলু ও নির্বাহী সমন্বয়কারী আবুল হাসান রুবেল। অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। গতকাল এক যৌথ বিবৃতিতে এ আহ্বান জানান গণসংহতি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার রাতেই হামলার ঘটনার ছবি ও ভিডিও গণমাধ্যমে এলেও জড়িতদের চিহ্নিত করতে পুলিশের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, অন্তর্বতী সরকারের সময় থেকে চলে আসা মাজারে হামলার ঘটনাটা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের ছিল। এই বিষয়ে সরকারের ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
অবিলম্বে হযরত সৈয়দ শাহ আলী বাগদাদীর (রহ.) মাজারে হামলার ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। সারা দেশে এর আগে ঘটে যাওয়া মাজারে হামলার প্রতিটি ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। আমরা সরকারকে এই দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানাই।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার রাতে কয়েকশ মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে মাজার প্রাঙ্গনে অবস্থান করা মুরিদ ও ভক্তদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হন।



