রাজশাহীর তানোরের মোহর গ্রামে কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য উৎসব

রাজশাহীর তানোর উপজেলার মোহর গ্রামে ৩৫০ বছরের এক বিশাল তেঁতুল গাছের তলায় ‘কৃষি প্রাণবৈচিত্র্য উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) আজর্ন্তাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষ্যে ‘একটি গাছ, একটি বাস্তুসংস্থান’ শীর্ষক প্রতিপাদ্যে তানোর উপজেলা জনসংগঠন সমন্বয় কমিটি, গ্রীণ কোয়ালিশন ও বাংলাদেশ রির্সোস সেন্টার ফর ইন্ডিজেনাস নলেজ (বারসিক) যৌথভাবে এই উৎসব আয়োজন করে।

উৎসবের মূল আকর্ষণ মানুষকে প্রকৃতির সাথে আন্তঃসম্পর্ক নতুনভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ এবং দেশীয় প্রাণবৈচিত্র্য ও কৃষি প্রতিবেশবিদ্যা সংরক্ষণের গুরুত্ব¡ তুলে ধরা। গাছের শিকড়ের নিচে যেমন কোটি কোটি অণুজীবের বসবাস, তেমনি ডালপালায় আশ্রয় নেয় পাখি, কাঠবিড়ালি, মৌমাছিসহ উপকারী পোকা মাকড়। একটি গাছ শুধু গাছ নয়-এটি জীবন, এটি কৃষি, এটি পৃথিবী।

একটি প্রবীণ গাছকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে একটি বাস্তুতন্ত্র। বাস্তুসংস্থান ও কৃষি প্রাণ-বৈচিত্র্য উৎসবে ১৪০ প্রজাতির ধান, সবজি ও গম বীজ। জলজ বাস্তুতন্দ্রের উপাদান শাপলা, শালুক, পদ্ম, শামুক, ঝিনুক, মাছ ধরার দেশীয় পরিবেশ বান্ধব উপকরণ, ৪৫ প্রজাতির অচাষকৃত শাকসবজি, বরেন্দ্র অঞ্চলের বিভিন্ন নদীর পানি, বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি বৈচিত্র্য, পরিবেশ বান্ধব চুলা উপস্থান করার মাধ্যমে পরিবেশের সকল উপাদান গুলোর মধ্য যে সম্পর্ক বিদ্যমান তা উপস্থাপন এবং অংশ নেওয়া কৃষক- কৃষানীরা নিজেদের মধ্যে বীজ বিনিময় করেন।

বারসিকের প্রোগ্রাম অফিসার অমৃত সরকারের সঞ্চালনায় উৎসবে ধারণাপত্র ও আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের গুরুত্ব উপস্থাপন করেন বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি মো. আতিকুর রহমান আতিক।

এতে তানোর উপজেলার ১০টি গ্রামের কৃষক-কৃষানী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, তরুণ-যুব সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। প্রাণ-বৈচিত্র্য সংরক্ষণের গৃহীত উদ্যোগ তুলে ধরে দুবইল গ্রামের কৃষক ও বরেন্দ্র বীজ ব্যাংকের সভাপতি মোঃ জায়দুর রহমান বলেন ‘দেশি ধান বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে প্রতি মৌসুমে আউশ, আমন, রোরো প্রভৃতি ১৭০ জাতের ধান চাষ করি এবং সেই ধান স্থাণীয় কৃষকদের সাথে বিনিময় করি। এসব ধানের জাত হারিয়ে গেলে, আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও গ্রামীণ সংষ্কৃতির নবান্ন উৎসবও হারিয়ে যাবে।

তানোর জগদীশপুরের কৃষানী মোসাঃ সেতারা বেগম বলেন, ‘আমি বিষমুক্ত সবজি চাষ করি, কোন রাসায়নিক সার ব্যবহার করি না। জৈব বালাইনাশক ব্যবহার করি। আমি বিভিন্ন ধরনের বীজ সংরক্ষণ এবং এলাকার মানুষ আমার থেকে বীজ নিয়ে যায়।’ তিনি বলেন, ‘আগে বাড়ির আঙিনায় অচাষকৃত শাক পাওয়া যেত। এখন আর পাওয়া যায় না। আমি বাড়িতে ৩০ প্রজাতির অচাষকৃত শাক চাষ করি। যা আমাকে পুষ্টি দেয়, শাকগুলো হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করি। আমি বিষমুক্ত সবজি চাষ করে খাই।’

মন্ডুমালা গ্রামের আদিবাসী কৃষানী মনিকা টুডু বলেন, ‘খাদ্য উপযোগি অনেক শামুক, ঝিনুক ও জলজ প্রাণী হারিয়ে গেছে, যা আমাদের খাদ্য সংষ্কৃতির অংশ। আমি একটি পুকুরে শামুক-ঝিনুক, শাপলা, শালুক সংরক্ষণে কাজ করছি। ফলে টিকে আছে জলজ প্রাণ-বৈচিত্র্য।

তানোরের স্ব-শিক্ষিত কৃষিবিজ্ঞানী নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘আগামীর জন্য আমাদের প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ করতে হবে। ফসলের জমিতে অবাধে কীটনাশক প্রয়োগ করা যাবে না। তানোরে প্রাণবৈচিত্র্যের আধার বিল কুমারী বিলে ফসল আবাদে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে অনেক প্রজাতির মাছ ও জলজ প্রাণ বিলুপ্ত হয়েছে। আমরা বিল কুমারী ও বিলজোয়ানায় মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে গ্রিন কোয়ালিশনের মাধ্যমে আলোচনা করছি।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments