স্বর্ণদ্বীপের বিস্তীর্ণ কৃষি অঞ্চল জুড়ে চলছে বাথান আতংক। কৃষকরা রাত জেগে ফসলি ক্ষেত পাহারা দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছে না। যখন তখন বাথানের মহিষ ও গরুর পাল ক্ষেতে ঢুকে ফসল ও সবজি খেয়ে ফেলে। এজন্য কৃষকরা ক্ষেতের চারদিক তারকাটার ঘেরা দিয়েও লাভ হচ্ছে না। রাতের আঁধারে বাথানিরা ঘেরা দেওয়ার খুঁটি উপরে ফেলে। ফলে বাথানের শত শত মহিষ-গরু ফসল সাবাড় করে দেয়। বাধা দিতে গেলে বাথানিরা একজোট কৃষকদের ওপর দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়।
হালকা লবনাক্ত পলি দোআঁশযুক্ত স্বর্ণদ্বীপের মাটিতে ধান, তরমুজ, বাদাম ও সূর্যমুখী চাষ করে ফসল ঘরে তোলা কৃষকের কাছে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আনুমানিক ৪০ টি বাথানে ১৫ হাজার গরু-মহিষ-ভেড়ার বিচরণভূমি স্বর্ণদ্বীপ। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি জমির ফসল সাবাড় করে বাথানের গরু-মহিষ-ভেড়া। এসব তথ্য স্বর্ণদ্বীপের ভূমিহীন কৃষকদের সাথে সরজমিন কথা বলে জানা গেছে।

নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার মেঘনা নদীর শেষ ভূমি থেকে অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে মেঘনা নদীর মিলনস্থল থেকে দক্ষিণে স্বর্ণদ্বীপের অবস্থান। চট্টগ্রামের স্বন্দ্বীপ থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে স্বর্ণদ্বীপের শেষ অবস্থান এবং হাতিয়া উপজেলার শেষ ভূমি থেকে ১৩ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত।
স্বর্ণদ্বীপের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর ২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং পূর্ব পশ্চিমে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রস্থ। এর আয়তন ৪০০ বর্গকিলোমিটার। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের আয়তন বেড়ে যাওয়ার পরিসংখ্যানের মধ্যে স্বর্ণদ্বীপের ৪০০ বর্গকিলোমিটার আয়তন যোগ হয়েছে। ওই বছর সরকার স্বর্ণদ্বীপের মালিকানার দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই দ্বীপে তিনি সেনা ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এখানে মিলিটারি ফার্ম ও কৃষি প্রজেক্ট চালু করে স্থানীয় খামারি ও কৃষকদেরকে সহায়তা করছে।

স্বর্ণদ্বীপের ৭০ হাজার একর জমির মধ্যে ৬ হাজার একর জমিতে ঝাউবন তৈরি করা হয়েছে। বিমান থেকে ২ টন কেওড়া বীজ সিড বম্বিংয়ের মাধমে প্রায় ৩০ হাজার একর জমিতে কেওড়া বনাঞ্চল তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া এই বনাঞ্চলে আরো বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ রয়েছে।
কেওড়া বনাঞ্চলের পাশাপাশি আনুমানিক ২০ হাজার একর জমি রয়েছে, যেখানে ধান, বাদাম, তরমুজ ও সূর্যমুখীর চাষ হয়। চাষযোগ্য জমিতে বর্ষা মৌসুমে কর্দমাক্ত হয়ে যায়। কোথাও কোথাও ১ ফুট থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত বর্ষা ও জোয়ারের পানি জমে থাকে। এই পরিস্থিতিতে স্বর্ণদ্বীপের জমিতে শুষ্ক মৌসুমে চাষাবাদ হয়।
গত ৫ বছর ধরে স্থানীয় ভূমিহীন প্রত্যেক কৃষকের মাঝে সর্বোচ্চ ১০ একর কৃষি জমি বাৎসরিক ৪০ হাজার টাকায় লিজ দিয়ে চাষাবাদ করা হচ্ছে।
মে থেকে অক্টোবর এই ৬ মাস স্বর্ণদ্বীপে বর্ষা মৌসুম বিরাজ করে। চলতি শুষ্ক মৌসুমে স্বর্ণদ্বীপের বেশিরভাগ কৃষক তাদের ক্ষেতের ফসল ঘরে তুলতে পারেননি। চাষ করা আমন ধানের খেতে বাথানের মহিষের পাল ঢুকে নষ্ট করেছে। অনেক তরমুজের ক্ষেতের তরমুজের ফুল আসার আগেই গরু, মহিষ ও ভেড়ার পাল খেয়ে ফেলেছে।

কৃষি জমি লিজ নেওয়া কৃষকদের মাথায় হাত। গতকাল এই প্রতিবেদক সরেজমিন সেখানে উপস্থিত হলে কৃষকরা তাদের হাহাকারের আর্তনাদ জানায়।
সেলিম নামের কৃষক জানালেন, ১১ বছর ধরে তিনি স্বর্ণদ্বীপের কৃষি জমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তিনি একজন ভূমিহীন কৃষক। ৩০ একর জমিতে তিনি ধান, তরমুজ ও বাদামের চাষ করেছিলেন। তিন মাস আগে থেকে একে একে বেশিভাগ জমির ফসল বাথানের মহিষের পাল ঢুকে তার সব ফসল শেষ করে ফেলেছে। এই মৌসুমে তার ১৫ লাখ টাকার ফসল একেবারেই শেষ হয়ে গেছে। বিগত বছরগুলোতে চাষাবাদ করে জমানো টাকা এ বছরে পথের ফকির হয়ে গেছেন।
মনির নামে একজন কৃষক জানান, ২ একর জমিতে তিনি সূর্যমুখী চাষ করেছিলেন। গত সপ্তাহে তার জমির ভিতর দিয়ে মহিষের পাল যাওয়ায় সূর্যমুখীর গাছ ভেঙ্গে যায়। কিছু গাছের সূর্য মুখী ফুল মহিষ খাওয়ার চেষ্টা করায় সেগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে।
সুবর্ণচরের ভূমিহীন কৃষক ফসি আলম স্বর্ণদ্বীপের ১৬ একর জমি লিজ নিয়ে স্বর্ণা ধান ও তরমুজ চাষ করেছিলেন। এরমধ্যে ধানখেত বাথানের গরুর পাল ঢুকে নষ্ট করে ফেলে। গত মাসে তরমুজের খেত থেকে একরাতে সব তরমুজ লুট হয়ে গেছে। খবর পেয়ে সুবর্ণচর থেকে মেঘনা নদী পাড় হয়ে স্বর্ণদ্বীপে এসে জানতে পারি যে রাতে একদল বাথানি খেতের তরমুজ লুট করে ট্রলারে করে পালিয়ে গেছে।
কৃষি জমিতে তারকাটার বেড়া দিয়েও ফসল বাথান থেকে রক্ষা করতে পারছে না। অভিযোগ রয়েছে, বাথানিরা অনেক সময় বেড়ার খুঁটি উপড়ে দেয়। এরপর রাতে মহিষের পাল ঢুকে ফসলের খেত সাবার করে ফেলে।
ভূমিহীন কৃষক আনোয়ার এমন অভিযোগ করে বলেন, তার জমির ধানের শীষ বের হওয়ার সময়ে তারকাটার বেড়ার খুঁটিগুলো বাথানিরা উপরে ফেলে।

স্বর্ণদ্বীপ সেনাক্যাম্প সূত্র জানায়, বর্তমানের স্বর্ণদ্বীপকে কেন্দ্র করে যে সম্ভবনার সৃষ্টি হয়েছে তার পেছনে ভূমিহীন দরিদ্র কৃষকদের শ্রম থাকলেও কিছু প্রভাবশালী বাথান মালিক, পূর্বের দখলকৃত জমির মালিক এবং অপরাধী চক্রের ভূমিকা এই উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়।
সেনাক্যাম্প সূত্রগুলো বলছে, স্বর্ণদ্বীপের বিশাল চারণভূমি একসময় স্থানীয় প্রভাবশালী বাথান মালিকদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেনাবাহিনীর আগমনে যখন সেখানে নিয়মতান্ত্রিক কৃষি ও ডেইরী খামার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখন এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাদের স্বার্থে আঘাত আসায় দরিদ্র কৃষকদের ওপর চড়াও হয়।
স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী এই বাথান মালিকরা তাদের বিশাল মহিষের পাল দিয়ে পরিকল্পিতভাবে দরিদ্র কৃষকদের কষ্টার্জিত ফসল ধ্বংস করে দেয় যা স্বল্পআয়ের কৃষকদের অর্থনেতিকভাবে পঙ্গু করে দিয়ে তাদের দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার একটি সুগভীর কৌশল।
নোয়াখালী জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বাথান মালিকরা তাদের বাথানে কাজ দেওয়ার নামে মূল ভূখন্ডের দাগি অপরাধী এবং এক সময়ের কুখ্যাত জলদস্যুদের আশ্রয় দিয়ে থাকে, ফলে বাথান মালিকেরা দ্বীপটিতে পলাতক আসামীদের পুলিশের নাগালের বাইরে থাকার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
স্থানীয় স্বর্ণদ্বীপ সেনা ক্যাম্প সূত্র জানায়, দ্বীপের নির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে কৃষকরা সেনাবাহিনীর একটি নিছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে থাকলেও দ্বীপের বাইরে কিংবা মূল ভূখন্ডে যাতায়াতের সময় তারা চরমভাবে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। আর এই সুযোগটিকেই কাজে লাগায় বাথান মালিকদের নিয়োগকৃত অপরাধী ক্যাডাররা। কৃষকরা যখনই প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দ্বীপের বাইরে যায়, তখনই তাদের উপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন করা হয়। যাতে তারা ভয়ে স্বর্ণদ্বীপে কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

মূলত এই প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং সাবেক জলদস্যুদের সমন্বয়ে গঠিত সিন্ডিকেটটি চায় না যে সাধারণ মানুষ বা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে সেখানে কোন টেকসই উন্নয়ন ঘটুক, কারন এতে তাদের দীর্ঘদিনের অবৈধ দখলদারিত্ব ও অপরাধমূলক সাম্রাজ্য হুমকির মুখে পড়ে। এই জটিল পরিস্থিতি কেবল সাধারন কৃষকদের জীবনকেই বিপন্ন করছে না বরং স্বর্ণদ্বীপকে কেন্দ্র করে জাতীয় অর্থনীতির যে সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন দেখা হচ্ছে, তাকেও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে।
এ ব্যাপারে সেনাবাহিনীর স্বর্ণদ্বীপের মিলিটারি ফার্মের অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল ডাঃ প্রণব কান্তি সাহা বলেন, কৃষি জমিতে বাথানের গরু-মহিষ ঢুকে ফসল নষ্ট করার অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা বাথানের মালিকদের বা তাদের প্রতিনিধিদের ডেকেছিলাম। ২০ জন বাথান মালিকের সাথে আমরা বৈঠক করেছি।
তিনি বলেন, তাদেরকে বলেছি যে একটা নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে বাথান সীমিত রাখতে হবে। কিন্তু তারা রাজি হয়নি।
তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট পরিমান জমি বাথানিরা লিজ নিয়ে তারা গরু-মহিষ-ভেড়া লালন পালন করলে আমরা ওই নির্দিষ্ট এলাকার নিরাপত্তা দিতে পারি। কিন্তু তারা কোনো সিদ্ধান্তের মধ্যে আসতে চায় না। সে কারণে বাথানের গরু-মহিষ কৃষি জমিতে উৎপাদিত সবজি ও ফসল নষ্ট করে।



