লিবিয়ায় অপহৃত বাংলাদেশী যুবক সোহেলকে উদ্ধার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী অপহরণ ও জিম্মিকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে । গ্রেফতারকৃতরা হলেন মাদারীপুরের দক্ষিণ কাউয়াকুড়ি গ্রামের আমির হামজা মীরের ছেলে টিটু ঢালী @ ম্যানেজার টিটু @ টিটু মীর(২৫), দত্ত কেন্দুয়া গ্রামের আইয়ূব আলী মাতুব্বরের স্ত্রী রহিমা বেগম (৫০) ও কুমিল্লার ব্রাক্ষ্মণপাড়া থানার মালাপাড়া গ্রামের নসু মিয়া দেওয়ানের ছেলে ইসমাইল দেওয়ান (৪৯)।

ভিকটিম সোহেলের স্ত্রী উর্মি বেগম গত ৬ এপ্রিল রাজধানীর তুরাগ থানায় দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, উর্মিও আত্বীয় হিসেবে আলাউদ্দিন কবিরাজ গত বছরের অক্টোবর মাসে ইতালি প্রবাসী রিয়াজুল মাদবরের সঙ্গে সোহেলের সাথে মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলিয়ে দেয়। রিয়াজুল মাদবর ও তার সহযোগীরা ভিকটিমকে বৈধ ভিসায় ইতালি পাঠানোর নিশ্চয়তা প্রদান করে।
রিয়াজুলের স্থানীয় ম্যানেজার পরিচয়ে টিটু মীরের সঙ্গেও মোবাইলে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। রিয়াজুল, আলাউদ্দিন ও টিটু মীরের সঙ্গে ভিকটিমের নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয় এবং মৌখিক চুক্তির মাধ্যমে তারা ভিকটিমকে ইতালি পাঠানোর বিনিময়ে মোট ২৪ লক্ষ টাকা দাবি করে। তাদের কথামতো প্রথমে ৪ লক্ষ টাকা প্রদান করা হয়। কথা ছিল বাকী টাকা ইতালি পৌছে দিবে।
পরবর্তীতে বিভিন্ন ধাপে বিভিন্ন কৌশলে বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে চাপ দিয়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আরও ৬ লক্ষ, ৫ লক্ষ ও ৮ লক্ষ টাকা আদায় করে। পরে রিয়াজুলের লোকজন ভিকটিম সোহেলকে লিবিয়ায় অন্য একটি চক্রের নিকট বিক্রি করে দেয়। নতুন এই চক্রটি তাকে অপহরণ করে এবং শুরু করে মুক্তিপণের জন্য ভয়ংকর নির্যাতন। সোহেলের ওপর চালানো নির্যাতনের ছবি ও ভিডিও পাঠিয়ে তার স্ত্রী ও আত্বীয় স্বজনকে ভিকটিম সোহেলকে জীবিত ফেরত পেতে হলে বাংলাদেশী টাকায় ২৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে।
শুধু বাদীকেই নয়, ভিকটিমের ভাই, বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের ইমো নম্বরে কল করে মারধর ও নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। এ বিষয়ে আসামী রিয়াজুল, আলাউদ্দিন ও টিটুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ভিকটিমকে দ্রুত মুক্ত করার আশ্বাস দিয়ে আরও ২০ লক্ষ টাকা দাবি করে এবং বিভিন্ন ধাপে ব্যাংকিং চ্যানেলে গ্রহণ করে। একইসঙ্গে তারা বাদী ও তার স্বজনদের মোবাইল ফোনের ইমো অ্যাপ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেয়।

দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও ভিকটিমকে উদ্ধার করা না হলে বাদী পুনরায় আসামী রিয়াজুলের বাড়িতে গিয়ে জানতে পারেন, রিয়াজুলের পরিবার, টিটু মীর ও হিমেল নামে আরও দুই ব্যক্তি রিয়াজুলের স্থানীয় ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছে এবং তারা পরস্পর যোগসাজশে বাদীর নিকট হতে বিপুল অর্থ আদায় করেছে। এছাড়া তদন্তে উঠে আসে, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে শতাধিক ব্যক্তিকে লিবিয়ায় পাচার করে প্রতারণা ও নির্যাতনের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে আসছিল।
অপহরণকারীরা ইমো আইডির নাম পরিবর্তন করে পুনরায় যোগাযোগ শুরু করে এবং দাবি করে যে, টিটুদের মাধ্যমে দেওয়া অর্থের কোনো অংশ তারা পায়নি। তারা ভিকটিমের ওপর আরও অমানবিক নির্যাতন চালাতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, ভিকটিমকে দীর্ঘদিন অনাহারে ও অর্ধাহারে আটকে রাখা হয়।
তার হাতের নখ প্লাস দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে মাংস কাটার ছুরি ও গ্লাস ভাঙ্গা দিয়ে ১৪১ টি পোচ দিয়ে রক্তাক্ত করা হয় এমনকি নগ্ন করে হাত-মুখ বেঁধে নির্যাতন করতে থাকে। এভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আরও ১৯ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে বিদেশে পাঠানো, মুক্তিপণ, ডলার ভাঙানোসহ বিভিন্ন অজুহাতে ভিকটিমের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৬৩ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়।

মামলাটির গুরুত্ব বিবেচনায় পিবিআই, ঢাকা মেট্রো (উত্তর) স্ব-উদ্যোগে মামলাটি অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। তদন্ত চলাকালে গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মামলার এজাহারনামীয় আসামী টিটু মীর ও রহিমা বেগমকে গ্রেফতার করা হয়।
তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন জব্দ করে ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন বার্তা, ভয়েস কল ও লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে বাদীর নিকট মুক্তিপণের টাকা দাবি, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব নম্বর প্রদান, বিদেশে অবস্থানরত রিয়াজুলের নির্দেশনা এবং আলাউদ্দিন ও হিমেলের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।
এছাড়া গোয়েন্দা তথ্য ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণ করে কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া থানা এলাকা হতে আসামী ইসমাইল দেওয়ানকে আটক করা হয়। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনেও লিবিয়ায় অবস্থানরত তার ভাই ইকবালের সঙ্গে মুক্তিপণের অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত বার্তা পাওয়া যায়।
মানব পাচার চক্রের ব্যবহৃত একাধিক ব্যাংক হিসাব বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট(বিএফআইইউ)-এর সহায়তায় ফ্রিজ করা হয়েছে। পিবিআই’র ধারাবাহিক অভিযান ও আসামীদের রিমান্ডে আনা, ব্যাংক একাউন্ট ফ্রীজ করাসহ নানা চাপে পড়ে চক্রটির সদস্যরা লিবিয়ায় জিম্মি ভিকটিম সোহেলকে ত্রিপলীর এয়ারপোর্ট রোড এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

পরে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশীদের সহায়তায় তিনি নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে পিবিআই, ইউএনওডিসি, লিবিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম (ইউএন মাইগ্রেশন)-এর সমন্বয়ে ভিকটিমকে নিরাপদ হেফাজতে নেওয়া হয়।
২৫ মে ভিকটিম সোহেলকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পিবিআই হেফাজতে গ্রহণ করে বিজ্ঞ আদালতে উপস্থাপন করা হয় এবং ভিকটিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করেছেন।



