ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি, গ্রাহকদের বিক্ষোভে পুলিশের লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড, রণক্ষেত্র মতিঝিল

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের নতুন চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল সোমবার সকালে রাজধানীর দিলকুশায় প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন সাধারণ গ্রাহকেরা। এ সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ, সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল এবং জলকামান ব্যবহার করে। এক পর্যায়ে পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

গতকাল সোমবার নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের ব্যাংকটিতে প্রথম যোগদানের কথা ছিল। নতুন চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে সকাল থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে শত শত গ্রাহক ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে মানববন্ধন শুরু করেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, সদ্য নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যান খুরশীদ আলম বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রæপ ‘এস আলমে’র ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

গ্রাহকদের অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে এবং জলকামান থেকে পানি ছিটিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এসময় আন্দোলনকারীরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে।

ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, সকাল থেকেই আন্দোলনকারীদের সরে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। এখানে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকের কার্যালয় রয়েছে। তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলা হলেও তারা সরে না যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বলপ্রয়োগ করতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের যোগদান ঘিরে কিছু ব্যক্তি ‘গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম ও ব্যাংকে হামলা প্রতিরোধ করতে পুলিশ বাধ্য হয়ে জলকামান ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে।

ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে কয়েকশ গ্রাহক ভোর থেকে ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে অবস্থান করছিল। তারা ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান যাতে যোগদান করতে না পারে সেই দাবি জানাচ্ছিল। তাদের দাবি, এই চেয়ারম্যান যোগদান করলে তাদের আমানত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পরে সকাল সোয়া ৯টার দিকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে আন্দোলনকারীদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। পরে তারা ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে থেকে সরে আশপাশের অলিগলিতে অবস্থান নেয়। পুলিশ ইসলামী ব্যাংক টাওয়ারের সামনে ঘেরাও করে রাখে।

প্রসঙ্গত, নতুন দায়িত্ব পাওয়া খুরশীদ আলম বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের আন্দোলনের মুখে তিনি পদত্যাগ করেন।

গ্রাহক ফোরামের ৫ দাবি:নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে চলমান আন্দোলনের মুখে ৫ দফা দাবি উত্থাপন করেছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’। দিলকুশায় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে এই দাবিগুলো তুলে ধরা হয়। দাবি আদায় না হলে আগামীতে লাগাতার কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনরত গ্রাহকেরা।

আন্দোলনকারী গ্রাহকদের ঘোষিত ৫ দফা দাবির প্রথমটি হলো, ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে অবিলম্বে নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান খুরশীদ আলমের অপসারণ। দ্বিতীয়ত, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওমর ফারুক খানকে পুনরায় ব্যাংকের দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য যোগ্য নতুন গভর্নর নিয়োগ অথবা বর্তমান গভর্নরের পদত্যাগ নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পূর্বে বিভিন্ন অনিয়মের দায়ে চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইসলামী ব্যাংকের সামনে বা আশেপাশে আসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। পঞ্চমত, এসব দাবি অনতিবিলম্বে পূরণ না হলে তীব্র ও লাগাতার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

রাস্তার আন্দোলনে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হবে না: বাংলাদেশ ব্যাংকের মূখপাত্র : গতকালকের পসিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো সিদ্ধান্তই রাস্তার আন্দোলনে পরিবর্তন হবে না। কোনো ব্যাংক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না। ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে সাংবাদিকদের সামনে এসব কথা বলেন তিনি।

আরিফ হোসেন খান বলেন, যেকোনো ইস্যুতে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির বিক্ষোভ প্রদর্শন বা মতপ্রকাশের অধিকার রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ারও এখতিয়ার আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক আবেগ বা চাপের ঊর্ধ্বে থেকে কেবল প্রতিষ্ঠানের জন্য যা উপযুক্ত এবং আইনগতভাবে সিদ্ধ, সে অনুযায়ী নিয়মতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

তিনি আরো বলেন, কোনো ব্যাংক যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের পরিচয়ে পরিচিত হতে চায় বা সেই পরিচয়ে বড় হতে থাকে, তবে তা ওই ব্যাংক টেকসই হওয়ার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক কার্যালয়ের বাইরে বিভিন্ন বিক্ষোভ ও কর্মকাÐের প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, কোনো কোনো ব্যাংক বিশেষ রাজনৈতিক সংগঠনের অঙ্গসংগঠনে পরিণত হচ্ছে কিনা!

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, কোনো ব্যাংকই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের হতে পারে না এবং রাজনৈতিক পরিচয় কোনো ব্যাংকের অস্তিত্বের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র জানান, সা¤প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবং সামাজিকমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে- এমন আশঙ্কায় ইসলামী ব্যাংকের বোর্ড সভা সরাসরি না করে ভার্চ্যুয়াল করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের অবস্থান সম্পর্কে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ কোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকেই রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।

গভর্নর ব্যাংক কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন, কাজ করতে গিয়ে তারা যদি কোনো রাজনৈতিক চাপের সম্মুখীন হন, তবে তা যেন সরাসরি জানানো হয়। সেই চাপ কর্মকর্তারা মোকাবিলা করতে না পারলে গভর্নর নিজে তা মোকাবিলা করনে বলে উল্লেখ করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments