ছয় নবজাতকের মায়েরা শোকে পাগলপ্রায়

তুরাগের কামারপাড়া হাইস্কুলের সামনে ওয়ালটনের মোড় সংলগ্ন তোতা মিয়া হাউজের পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখা গেলো, নবজাতকের ৪/৫ টি কাঁথা, তার জন্য কেনা জিরো সাইজের জামা বুকে জড়িয়ে ধরে অঝোর ধারায় কাঁদছেন এক প্রসূতি। মাঝে মধ্যেই কাপড়ের ঘ্রাণ নিচ্ছেন। মনে হচ্ছে যে তার নবজাতকের স্পর্শ পেলেন। চিৎকার করে কাঁদছেন। কখনও ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। কিছুতেই কান্না থামছে না।

গত ২৭ মে ঈদের আগের দিন মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে মারা যাওয়া ৬ নবজাতকের মধ্যে এক নবজাতকের মা তিনি। তার নাম ফাহিমা আক্তার। নবজাতকটি ছিল তার তৃতীয় সন্তান এবং কন্যা নবজাতক। নবজাতক মারা যাওয়ার দিনই তারা চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের রুস্তমপুর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করেন। ঈদ পরবর্তী ছুটি কাটিয়ে গতকাল সোমবার তারা সপরিবারে তুরাগের কামারপাড়ার বাসায় ফিরে আসেন।

কিভাবে নবজাতকের মৃত্যু হল বা চিকিৎসায় কোনো ত্রæুটি ছিল কি না জানতে চাইলে নবজাতকের মা কাঁদতে কাঁদতে কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তার স্বামী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘ভাই বাচ্চা মারা যাওয়ার পর সে একটু অস্বাভাবিক আচরণ করছে।’

আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় হাবিবুর রহমান বাদী হয়ে রমনা থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগ করে একটি মামলা করেছেন।

গতকাল কথা হয় হাবিবুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, বিশ্বাস করেন ভাই, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে রাতে একজনও ডাক্তার থাকেন না। দুই-তিন জন নার্স ডিউটি করেন। তারা কিছুই বলতে পারে না। ঘটনার দিন যদি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে ডাক্তার থাকলে, আমার নবজাতককে মরতে হত না। আমি আদ-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসার অব্যবস্থাপনার শাস্তি চাই।’

ঘটনাটি কিভাবে ঘটেছে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান বলেন, ঈদের আগের দিন রাত ৩ টার দিকে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে আমার শাশুড়ী খবর পাঠাল যে বেবি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তখন আমি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখি রিসিপশনে তিন জন নার্স বসে আছেন। তারা শুধু কাগজপত্রে কি জানি লেখালেখি করছিল। আমি বেবির মাকে ফোন করে বলি যে ওখানে কি ডক্টর নেই। বেবির মা জানায় কেউই নাই। কিন্তু অনেক বাচ্চা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। তখন আমার শাশুড়ী বেবিকে নিয়ে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে আসে। আমি বেবিকে নিয়ে দোতালা থেকে পাঁচ তলা পর্যন্ত গিয়ে কোনো ডক্টরকে পাইনি।

তিনি বলেন, ছয় তলা ভবনের ছয় তলায় এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার ডাক্তার দেখে বলে যে বেবির খাওয়া একটু বেশি হয়ে গেছে। ওর পেটে গ্যাস হয়েছে। ওরা (ডাক্তার) বেবিকে ঘাড়ের কাছে কোলে নিয়ে তার পিঠে আস্তে আস্তে থাবা দেওয়ার পদ্ধতি দেখিয়ে দিলেন। এতে নাকি বেবির পেটের গ্যাস কমে যাবে। আমি বেবিকে কোলে করে নিয়ে আবারও পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড-২ তে নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, আমি পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডের সামনে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি। এর মধ্যে ভোর সাড়ে ৫ টার দিকে দেখি ওয়ার্ডের সামনে দুই-একজন অভিভাবক বলছেন যে তাদের বেবি মারা গেছে। আমি তখন ভিতরে যোগাযোগ করি। তখন আমার স্ত্রী জানায় যে বেবি নাকি অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন অস্থির হয়ে যাই।

চিৎকার করতে থাকলে একজন নার্স এসে বলে, ‘নবজাতকরা এরকম কান্নাকাটি করেই। এ নিয়ে এত চিৎকারের কিছু নাই।’ আমি বললাম, ভিতরে অনেক বেবি নাকি মারা যাচ্ছে। আমি শাশুড়ীকে চিৎকার করে ফোনে বলি যে ওকে তাড়াতাড়ি বের কর। শাশুড়ী বেবিকে কোলে করে নিয়ে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ড থেকে বের হল। আমি যখন বেবিকে কোলে নেই, তখন দেখি ওর মুখ ও শরীর নীল হয়ে গেছে। আমি বেবিকে নিয়ে তাড়াতাড়ি ছয় তলায় এনআইসিইউতে নিয়ে গেলাম।

সেখানে নেয়ার পর এনআইসিইউ’র ডক্টররা দেখে বলেন, বেবির তো কোনো হার্টবিট নেই। ও তো আগেই মারা গেছে। এই বেবি কোথায় ছিল? আমি বলি, পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে। তখন ডক্টররা বলে যে তাহলে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে বেবি মারা গেছে।

আমি তখন আমার বেবিকে বুকে জাপটে ধরে বললাম, ‘তোর মুখের চেহেরা এত সুন্দর, তোকে তো আমি বাঁচাতে পারলাম না। তুই আমাকে মাফ করে দিস। বাবা হয়ে তোর কাছে মাফ চাইছিরে মা।’

হাবিবুর রহমান বলেন, আমার মেয়ে বেবিটা হয়েছিল ২৪ মে দুপুর ২ টার দিকে। বেবি হওয়ার পর আমি আদ-দ্বীন হাসপাতালের মসজিদে নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করেছিলাম।

তিনি বলেন, পৃথিবীতে এসেই তিন দিনের মধ্যে চলে গেলো, সেটি তার তৃতীয় সন্তান ছিল। প্রথম সন্তান ছেলে ক্লাশ টুতে এবং দ্বিতীয় সন্তান সাড়ে ৫ বছর বয়সের মেয়ে স্থানীয় একটি স্কুলে নার্সারী শাখায় পড়ে।

ছয় নবজাতকের মধ্যে যমজ ছিল ঃ ছয় নবজাতকের মধ্যে দুই নবজাতক জমজ ছিল। তাদের বয়স ৪ দিন। দুজনেই ছেলে। জমজ শিশুদের বাবা হাসান সরদারের বাড়ি রাজধানীর খিরগাঁওয়ের মাদারটেক এলাকায়। গতকাল তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

হাসান সরদার ও নাজমা বেগম দম্পতির জমজ সন্তানের এমন মৃত্যুর সঠিক কোনো কারণই জানতে পারেননি।
তিনি বলেন, কেউ বলে এসি নষ্ট ছিল। কেউ বলে বিষাক্ত গ্যাস থেকে এমন হয়েছে। কেউ সঠিক কথা বলছে না। আমি মাছের ব্যবসা করি। ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় আমার ভাই ও বোন হাসপাতালে স্ত্রীর পাশে ছিল। তারাও বলতে পারছে না কি হয়েছে।

যমজ নবজাতক হারিয়ে বাকরুদ্ধ এই বাবা বলেন, আমার বোন বলেছে, ওই দিন রাত তিনটার দিকে যমজ দুই নবজাতক হঠাৎ করে এক সঙ্গে কান্না শুরু করে। পরে বমি করে। এরপর থেকেই অবস্থা খারাপ হয়। এনআইসিইউতে ডাক্তারদের কাছে নিয়ে গেলে তারা দেখছি বলে প্রথমে পোস্ট অপারেটিভ ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেয়। পরে ভোরের দিকে অবস্থা খারাপ হলে এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও আর বাঁচানো যায়নি।

বলেন, হাসপাতাল থেকে জানাজাসহ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দুজনকে এক সঙ্গে খিলগাঁও কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। শুনেছি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। ওই তদন্ত কমিটি আমাদের বক্তব্য নিবে। আমরা আমাদের অভিযোগ জানাতে চাই। আমরা আদ-দ্বীন হাসপাতালের চিকিৎসার এই অব্যবস্থাপনার বিচার চাই।

এদিকে, এই ঘটনায় মারা যাওয়া অন্যরা হলো- মুন্সিগঞ্জের আকাইদ হোসেন আরিফ ও মিম দম্পতির ৩ দিন বয়সী মেয়ে নবজাতক, দোহারের সাইদুল ও ফারিহা দম্পতির ৩ দিন বয়সী মেয়ে এবং নরসিংদীর রুহিতপুরের শান্ত ও জান্নাত দম্পতির ছেলে নবজাতক।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments