দেশে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়তে যাচ্ছে। আজ বুধবার বিদ্যুতের নতুন পাইকারি ও খুচরা মূল্যহার ঘোষণা করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পাইকারি পর্যায়ে প্রায় ১৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম বাড়তে পারে।
গত এপ্রিলে ও চলতি জুনে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর উদ্যোগে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়বে বলে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, কমিশনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং নতুন মূল্যহার ঘোষণা করা হবে। আজ বুধবার রমনায় ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্সে কমিশনের শুনানি কক্ষে বিদ্যুতের পাইকারি, সঞ্চালন ও খুচরা মূল্যহার পুননির্ধারনের প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে বলে গতকাল বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
গত ৩ থেকে ৬ মের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদক, সঞ্চালক ও বিতরণকারী সংস্থা-কোম্পানিগুলো বিইআরসিতে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা দাম এবং সঞ্চালন মাশুল বাড়ানোর আবেদন করে। গত ২০ ও ২১ মে বিইআরসির গণশুনানিতে রাজনৈতিক নেতা, ভোক্তা অধিকারকর্মী, ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন। তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা ও অপচয়ের দায় সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপানো হচ্ছে।
সরকারের নীতিনির্ধারনী পর্যায়ের একাধিক ব্যক্তি জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম না বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নিলেও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান ভর্তুকির চাপ সামলাতেই বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মূলত: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে এই আমদানি নির্ভরতা ও ব্যয় বৃদ্ধির, দীর্ঘদিনের আর্থিক দায় এবং ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। নীতি সংস্কার করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত পুনগর্ঠনে সরকারের আরও সময় লাগবে। কিন্তু ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া চাপ সামলাতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিকল্প দেখছে না সরকার।
তারা আরও জানান, বিদ্যুতে ভর্তুকি কত পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে তা অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে। সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিভাগ বাজেট খসড়া তৈরি করে বিইআরসিকে জানিয়েছে। ভর্তুকির প্রতিশ্রুত পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুতের দাম ঘোষনা করবে বিইআরসি। দাম বাড়ানোর পরও সরকারের বার্ষিক ভর্তুকির পরিমাণ থাকবে বিপুল। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে অর্থ ব্যবস্থাপনায় বিইআরসি একটি ফর্মুলা এবং এক গুচ্ছ সুপারিশও প্রদান করতে পারে।
এছাড়া বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচ ছিল প্রতি ইউনিট ২ টাকা ১৩ পয়সা। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ টাকা ১৬ পয়সা। ২০২২ সালে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রায় সাড়ে ৮ টাকায় পৌঁছায়। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় প্রায় ১৩ টাকা, যেখানে প্রতি ইউনিটে ঘাটতি রয়েছে প্রায় ৬ টাকা।
শুনানিতে দেওয়া পিডিবির হিসেবে অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ৩২ হাজার ৭১০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। হাতে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র ৩ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা। অথচ এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ের জন্য অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হবে আরও ১৫ হাজার ২৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা।
অন্যদিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সম্ভাব্য ঘাটতি বেড়ে ৬৫ হাজার ৫৫৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর মধ্যে সম্প্রতি জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত ঘাটতি ধরা হয়েছে ১১ হাজার ২৬৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা।



