প্রতিষ্ঠিত সন্তানদের মায়ের শেষ জীবনে মিলল পচাগলা মরদেহ

ছেলেরা সমাজের উঁচুতলার মানুষ। একজন সরকারের যুগ্ম সচিব, আরেকজন বুয়েটের শিক্ষক, মেয়ের জামাতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক। অথচ এই ‘সফল’ সন্তানদের জন্মদাত্রী মা নুরজাহান বেগম (৭৫) নিজের ঘরেই মরে পড়ে রইলেন চরম অবহেলায়।

রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকার ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকে নিজের বাড়ির একটি ফ্ল্যাট থেকে রবিবার (১ জুন) রাতে এই বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা ‘৯৯৯’-এ কল পেয়ে পুলিশ যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তখন পুরো ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়েছে লাশের তীব্র দুর্গন্ধ।ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ দেখতে পায়, পুরো বাসাটি ছিল নোংরা, অগোছালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও ডাস্টবিনের নোংরা ছড়ানো ছিটানো।পুলিশের ধারণা, অন্তত এক সপ্তাহ আগে নুরজাহান বেগমের মৃত্যু হয়েছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাছির জানান, বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম মিরপুরের ওই ফ্ল্যাটে তার মেয়ের সাথেই থাকতেন। কিন্তু ফ্ল্যাটের ভেতরে তাকে রাখা হয়েছিল সম্পূর্ণ আলাদা, অগোছালো এবং আবর্জনায় ভরা এক অন্ধকার কক্ষে।

পুলিশ বলছে, ওই বৃদ্ধা নারী তিন সন্তানের জননী। বড় ছেলে সরকারের যুগ্ম সচিব। নাম আনিসুর রহমান। তিনি খুলনা বিভাগে কর্মরত। অন্য আরেক সন্তান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। মেয়ে কনিকা স্কুল শিক্ষিকা। নুরজাহান বেগমের দুই ছেলে আলাদা থাকতেন। মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। তবে মায়ের পাশের কক্ষে বসবাস করা মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।

স্থানিয় বাসিন্দারা বলছেন, কনিকা তার সন্তানদের নিয়ে অন্যত্র ভাড়া থাকেন। আবার কেউ বলেন, কনিকা পাশের কক্ষে থাকতেন। ৫ দিন পর একবার করে খাবার দিতে আসেন কনিকা। সেই খাবার পাঁচ তলার ফ্ল্যাটে পেছনের দরজায় রেখে যেতেন। বৃদ্ধা নুরজাহান মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে এসে সেই খাবার নিয়ে যেতেন।
মা-মেয়ে একই বাসায় পাশাপাশি রুমে থাকতো জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি একদম নোংরা, একদম ডাস্টবিনের মতো অবস্থা। মেয়ে হয়তোবা মানসিকভাবে একটু অসুস্থ। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি মারা যান।

ওসি বলেন, ভয়াবহ ব্যাপার হলো, একই ফ্ল্যাটে বসবাস করেও গত এক সপ্তাহে মায়ের কোনো খোঁজ নেননি মেয়ে বা পরিবারের অন্য সদস্যরা। ওসির দেওয়া তথ্যমতে, কয়েকদিন ধরে বৃদ্ধার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রবিবার এক নার্সকে ডেকে আনা হয়। ওই নার্স কক্ষে ঢুকে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান। এরপরই পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পুলিশের প্রাথমিক সুরতহালে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কোনো যত্ন বা পরিচর্যা না পেয়ে ঘরটি যেমন আস্তাকুঁড়ে পরিণত হয়েছিল, তেমনি বৃদ্ধার শরীরও কঙ্কালসার হয়ে গিয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর সময় বা কারণ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা কোনো সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ বলছে, ওই বৃদ্ধা নারী তিন সন্তানের জননী। বড় ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম সচিব। অন্য আরেক সন্তান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং মেয়ে স্কুল শিক্ষিকা। নুরজাহান বেগমের দুই ছেলে আলাদা থাকতেন। মায়ের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না তাদের। তবে মায়ের পাশের কক্ষে বসবাস করা মেয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল বলে ধারণা করছে পুলিশ।

বৃদ্ধার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি হাসান বাছির বলেন, কি বলবো, এবনরমাল টাইপ (অস্বাভাবিক ধরনের) সব ভাইবোনরা। তার যে ছেলে বুয়েটের টিচার তাকে জিজ্ঞাসা করলাম আপনার বড় ভাইয়ের মোবাইল নম্বর দেন, তিনি আমাকে দেখি একটা সিটি সেল নম্বর বের করে দিছেন। সেই ২০১১ সালে যে সিটি সেল বন্ধ হয়ে গেছে। মানে ভাইয়ের সঙ্গে ভাইয়ের যোগাযোগ নাই। তার কাছে তার ভাইয়ের কোনো কারেন্ট নম্বর নেই।

এই ঘটনা সামনে আসার পর স্থানীয় এক বাসিন্দা চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, যুগ্ম সচিব আর বুয়েটের প্রফেসর হয়ে কী লাভ হলো, যদি নিজের মায়ের খবর রাখার মতো সময় বা যোগ্যতা না থাকে? এরা সমাজের বড় বড় জায়গায় লেকচার দেয়, অথচ নিজেদের মা ঘরের কোণায় পচে মরছে তা জানে না!

পল্লবী থানা পুলিশ জানিয়েছে, এই ঘটনায় আপাতত একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে যদি অবহেলা বা অন্য কোনো সন্দেহজনক আলামত মেলে, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ওসি বলেন, ভুক্তভোগী বৃদ্ধার মেয়েকে দেখে স্বাভাবিক মনে হয়নি। মা মরে পচে আছেন, অথচ তিনি নাকি গন্ধও পাননি। তার কথাবার্তায় অসংলগ্নতার কারণে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তে পর মরদেহ তার বুয়েটের শিক্ষক ছেলে গ্রহণ করেছেন বলেও জানান তিনি।

এ ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। মৃত্যুর কারণ উদঘাটনে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments