প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেছেন, বর্তমান সরকার দেশের সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করে। তাই সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের মতো বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের এলাকাতেও সমানভাবে উন্নয়ন কাজ করা হবে। একইসঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা থাকলে সরকার তা গ্রহণ করবে বলেও জানান তিনি।
বুধবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের এলাকার উন্নয়ন ও কর্মপরিধি নিয়ে কথা বলেন।
এলাকার উন্নয়নে সরাসরি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং নারী সংসদ সদস্য, উভয়েরই কাজ করার অধিকার রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের বিষয়ে সরকারি নিয়মানুযায়ী আমরা এগোচ্ছি। আপনার এলাকার উন্নয়নের বিষয়ে আমার সহযোগিতা করার কিছু থাকলে জানাবেন, আমি সরাসরি সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।
পরবর্তীতে সংসদ সদস্য আনিছুর রহমানের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের সুষম উন্নয়ন এবং বিরোধী দলের প্রতি সরকারের সহযোগিতার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
স্পিকারের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েকদিন আগে সংসদ কীভাবে চলবে সে বিষয়ে কমিটির একটি বৈঠক ছিল। সেখানে বিরোধীদলীয় নেতাও ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, ঈদের আগে সরকারের (এলজিইডি) পক্ষ থেকে দেওয়া কিছু সহযোগিতা হয়তো বিরোধীদলীয় অনেক সংসদ সদস্য পাননি। আমি ওই বৈঠক থেকে বেরিয়েই এলজিইডি মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উভয়কেই সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশনা দিয়েছিলাম, বিরোধীদলীয় কোনো সংসদ সদস্য যদি না পেয়ে থাকেন, তবে যাতে দ্রুত সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সম-উন্নয়নে বিশ্বাস করে। সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা যেভাবে এলাকার উন্নয়ন করবেন, ঠিক একইভাবে সরকারের সম্পূর্ণ সহযোগিতা থাকবে বিরোধীদলীয় সদস্যবৃন্দ যারা আছেন, তাদের এলাকাতেও। আমরা সমানভাবে কাজ করার চেষ্টা করব।
সরকারের পক্ষ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা দেওয়ার পরও সরকারি দলের বিরুদ্ধে যেসব অপপ্রচার হয়, সেগুলো বন্ধে বিরোধীদলের সঙ্গে কোনো আলোচনা হবে কি না, সংসদ সদস্য আনিসুর রহমান এমনটি জানতে চাইলে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আমার মনে হয় এ বিষয়ে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। সবেমাত্র শুরু হলো, লেট আস ওয়েট অ্যান্ড সি।
এরপর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এই সরকার জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক একটি সরকার। কাজেই যদি গঠনমূলক কোনও সমালোচনা থাকে, অবশ্যই সেটি আমরা গ্রহণ করব এবং সেভাবে আমরা পদক্ষেপ নেব।
সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বৈরাচারের পতনের পরে আমরা আগেও দেখেছি এবং পতনের পরে আমরা আরও পরিষ্কারভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, কীভাবে দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই দেশকে গড়ে তুলতে হলে অর্থনৈতিক সুশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং একই সাথে দেশে ব্যবসা-বান্ধব একটি পরিস্থিতি বা পরিবেশও গড়ে তুলতে হবে।
এই সরকারের প্রথম বাজেটে আমরা চেষ্টা করেছি দেশে যারা ব্যবসায়ী আছেন তারা যেন বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ী হতে পারেন, ট্রেডারও হতে পারেন অথবা ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট হতে পারেন। যেই হোন না কেন প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য এমন সুবিধা তৈরি করা যেখানে তারা সুন্দরভাবে ব্যবসা করতে পারে।
কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারে। সেইভাবেই আমরা চেষ্টা করছি এবারকার বাজেটটি তৈরি করতে। তারই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকার দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সহজকরণ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণলয় কর্তৃক কতগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমদানি ও রপ্তানি প্রধান নিয়ন্ত্রকের দফতর হতে আমদানি ও রফতানি নিবন্ধন প্রক্রিয়া অনলাইনের মাধ্যমে দ্রুততর সময়ের মধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির জন্য রফতানি নীতি হালনাগাদ করা হয়েছে এবং আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ হালনাগাদকরণ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সহজে বাজারে প্রবেশ করতে পারেন।
রফতানির উদ্দেশ্যে আমদানির ক্ষেত্রে অশুল্ক বাধা দূর করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বন্ডেড এবং নন-বন্ডেড সকল প্রতিষ্ঠানসমূহকে এফওসি (ফ্রি অব চার্জ অর ফ্রি অব কস্ট) ভিত্তিতে আমদানির সুযোগের আওতা আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর লক্ষ্যে নতুন বন্দর অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান সুবিধার সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
লালদিয়া টার্মিনাল চলতি বছর কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং বে-টার্মিনাল প্রকল্পের বাস্তবায়ন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। একই সঙ্গে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজ অগ্রসর হচ্ছে, যা সম্পন্ন হলে বৃহৎ জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করতে পারবে এবং দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
জহরত আদিব চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আগে একটি বিষয় ছিল-তারা লভ্যাংশ নিতে না পারলে কেন এখানে বিনিয়োগ করবে? এ সমস্যাটা আইনের মাধ্যমে সমাধান করেছি। তিন-চারদিন আগে হওয়া মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছি-বিদেশ থেকে কোন বাংলাদেশী বা বিদেশী নাগরিক বিদেশী বিনিয়োগ দেশে নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে তাদেরকে বিনিয়োগের ১ দশমিক ৫ শতাংশ পরামর্শক ফ্রি বা কমিশন দেব, প্রণোদনা তাদের দেব।
সংসদ সদস্য শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে। পাইলটিং পর্যায়ে এখন পর্যন্ত ৬০ হাজার ৪৪টি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত ২০ হাজার ৭৪৮জনকে কৃষক কার্ড দেওয়া হয়েছে। শস্য, ফসল, পশুপালন ও মৎসখাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হয়েছে।
সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণপূর্বক প্রতিরোধমূলক ও দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা পরিহার করে দ্রুত, বাস্তবসম্মত ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে সততা, মেধা ও দক্ষতাকে একমাত্র মানদন্ড হিসেবে অনুসরণ করতে হবে।
সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ৫ বছরের মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিন, ২০২৬-২৭ অর্থবছর এবং আগামী ৫ বছরের জন্য মেগা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছে। ১৮০ দিনের মধ্যে ৫টি জেলায় (খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী) ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান শুরু হবে। এটি ইলেকট্রনিক পেশেন্ট রেফারেল ও ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।
সরকার ৫ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অধীনস্থ দপ্তরে শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন লোক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আগামী অর্থবছরে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ লাখ শিশুর মাঝে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ এবং পর্যায়ক্রমে ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।
এছাড়া ল্যাঙ্গুয়েজ স্টুডেন্ট ভিসায় বিদ্যমান জামানতবিহীন ঋণ সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১০ লাখ টাকা করা হয়েছে এবং জাপানগামীদের ভিসা প্রাপ্তি সহজ করা হয়েছে।



